টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স। তবে স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কৌশল বা একাদশ নয়, বরং এনগোলো কান্তে।
ফরাসি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ক্লোজড-ডোর অনুশীলনে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার। এরপর থেকেই সমর্থকদের একাংশের দাবি, স্পেনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কান্তেকে অন্তত সুযোগ দেওয়া উচিত।
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের ছয় ম্যাচের একটিতেও মাঠে নামেননি কান্তে। কোচ দিদিয়ে দেশম মাঝমাঠে আস্থা রেখেছেন কুয়াদিও কোনে ও আদ্রিয়েন রাবিওর ওপর। এই জুটিকে নিয়েই অনায়াসে সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে লে ব্লুরা।
তবু বড় ম্যাচে কান্তের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারের গুরুত্ব আলাদা বলেই মনে করছেন অনেকে। আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে ছুটে না বেড়ালেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সময়ে বল পুনরুদ্ধার এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও তার বড় শক্তি।
বিশেষ করে স্পেনের বিপক্ষে এই গুণগুলো আরও বেশি প্রয়োজন হতে পারে। বলের দখল ধরে রেখে দ্রুত পাসিং এবং মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে লা রোহাদের জুড়ি নেই। এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কান্তের ট্যাকল, ইন্টারসেপশন এবং ট্রানজিশন ফুটবল ফ্রান্সের জন্য বাড়তি অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নকআউট ম্যাচে কখনও কখনও একটি ট্যাকল কিংবা একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আর ঠিক এমন মুহূর্ত তৈরির ক্ষমতার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত কান্তে।
বর্তমানে তুরস্কের ক্লাব ফেনারবাচেতে খেললেও তার অর্জনের তালিকা এখনও সমৃদ্ধ। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও প্রিমিয়ার লিগসহ ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফিই রয়েছে তার ঝুলিতে।
এখন দেখার বিষয়, স্পেনের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালে দেশম কি শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ কান্তের ওপর ভরসা রাখেন, নাকি আগের মতোই অপরিবর্তিত মাঝমাঠ নিয়েই মাঠে নামবে ফ্রান্স।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডের সময় মাঠেই মেজাজ হারান জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটার তানাকা চিভাঙ্গা। এ কারণে তাকে শাস্তি দিয়েছে আইসিসি। তাকে তিরস্কার করার পাশাপাশি তার নামের সাথে একটি ডিমেরিট পয়েন্টও যুক্ত হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা।
ফলে লেভেল ওয়ান পর্যায়ের অপরাধের জন্য চিভাঙ্গাকে সাজা দিয়েছে আইসিসি। আইসিসির কোড অব কনডাক্টের ২.৩ ধারা ভেঙে লেভেল ওয়ান পর্যায়ের অপরাধ করেছেন চিভাঙ্গা। এই ধারায় ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে এমন অশালীন শব্দ বা গালিগালাজ ব্যবহার করা, যা স্পষ্টভাবে শোনা যায়’ এর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চিভাঙ্গা এই নিয়ম ভেঙেই পেয়েছেন সাজা।
শেষ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন চিভাঙ্গা। বল থ্রো করার জন্য সতীর্থ ইনোসেন্ট কাইয়াকে বেশ তাড়া দিচ্ছিলেন চিভাঙ্গা। কাইয়া তা করতে না পারায় স্পষ্টভাবে শোনা যায় এমনভাবে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন চিভাঙ্গা। পরবর্তীতে চিভাঙ্গা এই অভিযোগ স্বীকার করে নেন এবং ম্যাচ রেফারি ডেভিড গিলবার্টের প্রস্তাবিত শাস্তি মেনে নেন। ফলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানির প্রয়োজন হয়নি।
অবশ্য এরপর মাঠের আম্পায়ার আল্লাহুদ্দিয়েন পালেকার এবং ফরস্টার মুটিজওয়া, তৃতীয় আম্পায়ার আইনো ছাবি এবং চতুর্থ আম্পায়ার পারসিভ্যাল সিজারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি আনেন।
আইসিসির জুন মাসের সেরা ক্রিকেটারের মনোনয়ন পেয়েছেন এই অলরাউন্ডার। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ছাড়াও তালিকায় আছেন নিউজিল্যান্ডের নাথান স্মিথ এবং ভারতের শুবমান গিল। গত জুন মাসে নিজ নিজ দলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে মাসের সেরার এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন তিন দেশের তিন ক্রিকেটার। যার মধ্যে একজনকে মাসের সেরার খেতাব দেবে আইসিসি। প্রায় চার বছর দলে ফেরা মোসাদ্দেকের প্রত্যাবর্তনটা হয়েছিল রাজকীয়।
নিজেদের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে দলে ফিরেই ব্যাটে-বলে দারুণ উজ্জ্বল ছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। প্রথম ম্যাচেই খেলেছেন ৮৬ রানের হার না মানা ইনিংস। সাথে নেন ২ উইকেটও। হয়েছেন ম্যাচসেরা। সিরিজের ৩ ম্যাচ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫৭ রান আসে মোসাদ্দেকের ব্যাট থেকে। যেখানে ছিল জোড়া ফিফটি। অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ দল।
টাইগারদের জয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন মোসাদ্দেক, জিতেছেন সিরিজসেরার পুরস্কারও। এ বিষয়ে গতকাল মোসাদ্দেক বিসিবির পাঠানো ভিডিও বার্তায় বলেন,‘জাতীয় দলের হয়ে নিজের চাওয়া অনেক ওপরে। সামনে দলের জয়ের প্রয়োজনে ভালো করতে চাই। দল যখন আমার কাছে যা চাইবে তাই দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’ তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের ম্যাচগুলো হবে বুলাওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবে ম্যাচগুলো যথাক্রমে মাঠে আগামী ১৫, ১৭ ও ১৯ জুলাই। এ বিষয়ে তিনি বলেন,‘আমরা টি-টোয়েন্টিতে ভালো করতে চাই। তবে এখানকার আবহাওয়া একটু ভিন্ন আমরা মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছি।’
এছাড়া ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে স্মরণীয় এক সিরিজ জয় পেয়েছে নিউজিল্যান্ড। লর্ডসে প্রথম ম্যাচে হারলেও পরের দুই ম্যাচে জিতে দারুণ এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে কিউইরা। যেখানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিউই পেসার নাথান স্মিথ। ৩ ম্যাচে ১৬ উইকেট শিকার করে সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী ছিলেন নাথান, জিতেছেন সিরিজসেরার পুরস্কারও। ভারতের টেস্ট এবং ওয়ানডে অধিনায়ক শুবমান গিল জুন মাসে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ভারতের হয়ে ১২৬ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলেছেন অধিনায়ক গিল। সেই ফর্ম ধরে রেখেছেন ওয়ানডে সিরিজেও। দুই ম্যাচ মিলিয়ে করেছেন ২৩৮ রান। আফগানদের বিপক্ষে সব ম্যাচ জিতেছে ভারত। সিরিজসেরার পুরস্কার জিতেছেন শুবমান গিল। নারীদের মধ্যে জুন মাসের সেরা ক্রিকেটারের মনোনয়ন পেয়েছেন ভারতের শ্রী চরণী, স্কটল্যান্ডের ক্যাথরিন ব্রাইস এবং ইংল্যান্ডের ড্যানি ওয়াট-হজ।
ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার ম্যাচগুলো সবসময়ই ফুটবলের স্ট্র্যাটেজিক মাস্টার ক্লাস হয়ে থাকে। একদিকে স্পেনের বল পজিশন ও হাই-প্রেসিং ফুটবল, অন্যদিকে ফ্রান্সের সলিড ডিফেন্স ও কাউন্টার-অ্যাটাক ফুটবল। দুই পরাশক্তির এই লড়াইকে তাই বলা হচ্ছে ‘ফ্রান্স-স্পেন সেমিফাইনাল ট্যাকটিক্যাল মাস্টার ক্লাস লড়াই’!
ট্যাকটিক্যাল ফরমেশন ও লাইনআপঃ
স্পেন: ম্যাচটিতে দুই দলই তাদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন দুটি দর্শনে মাঠে নামে যেমন- স্পেন ৪-৩-৩ এটা তাদের ঐতিহ্যবাহী পাসিং ফুটবল এবং উইং-ভিত্তিক আক্রমণের ওপর ভরসা রাখে। মাঝমাঠে রদ্রি খেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন, আর দুই উইঙ্গে লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার মূল দায়িত্বে থাকেন।
ফ্রান্স: দেশম সাধারণত একটি রক্ষনাত্মক ও ভারসাম্যপূর্ণ দল নামাতে পছন্দ করেন। মাঝমাঠে চুয়ামেনি এবং কান্তে স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্ব পালন করবেন, যা ডিফেন্সকে বাড়তি সুরক্ষা দেয়। আর আক্রমণে কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওলিসে, দেম্বেলে নিজের গতি দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার অপেক্ষায় থাকেন।
মাঝমাঠের যুদ্ধ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধঃ
স্পেনের পজিশনাল ফুটবল: মূল লক্ষ্য ত্রিভুজ তৈরি করে পাসিংয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের মিডফিল্ড ব্লক ভেঙে আক্রমনে ওঠা, রদ্রি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড থেকে খেলা তৈরি করেন, যা ফ্রান্সের ফরোয়ার্ডদের প্রেসিং করতে বাধ্য করবে।
ফ্রান্সের লো-ব্লক ও মিড-ব্লক: ফ্রান্স কখনোই স্পেনের সাথে বল পজিশনের লড়াইয়ে যায়নি। তারা নিজেদের অর্ধে জমাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এনগোলো, কান্তের ওয়ার্ক-রেট এবং হস্তক্ষেপ স্পেনের মিডফিল্ড থেকে ফাইনাল থার্ডে বল জোগান দেওয়ার রাস্তা অনেকটাই বন্ধ করে দেয়।
উইং বনাম ফুলব্যাক দ্বৈরথঃ
স্পেনের ওভারলোডঃ স্পেন তাদের ফুলব্যাকদের যেমন- কুকুরেলা বা পেদ্রোদের ওপরে তুলে এনে উইঙ্গারদের সাথে ওভারল্যাপ করায়। লামিন ইয়ামাল তার ইনসাইড-কাটিং মুভমেন্ট দিয়ে ফ্রান্সের লেফট-ব্যাককে পরাস্ত করার চেষ্টা করেন।
ফ্রান্সের ডাবল-আপ ডিফেন্স: ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামসের গতি ও ড্রিবলিং সামলাতে ফ্রান্সের উইঙ্গারদেরও নিচে নেমে ডিফেন্স করতে হতে পারে থিও হার্নান্দেজকে সাহায্য করতে ফ্রান্সের মিডফিল্ডাররা উইংয়ের দিকে শিফট করেন, যাতে স্পেন ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে।
আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের কৌশলঃ
স্পেনের হাই-প্রেস: বল হারালেই স্পেন সাথে সাথে ‘কাউন্টার-প্রেস’ করে ফ্রান্সের হাফেই বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য ছিল এমবাপ্পে বা দেম্বেলেরা যেন বল পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় না পান।
ফ্রান্সের ডিরেক্ট ফুটবল: ফ্রান্স বল জেতার সাথে সাথেই সময় নষ্ট না করে লং-বল বা থ্রু-বলের মাধ্যমে স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্সের পেছনে এমবাপের গতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। স্পেনের ডিফেন্ডাররা কিছুটা ওপরে থাকায় তাদের পেছনে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, সেটাই ছিল ফ্রান্সের মূল টার্গেট।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ও ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনঃ
স্পেনের ক্লিনিকাল ফিনিশিং: স্পেনের তরুণ তুর্কিদের হাফ-চান্স থেকে গোল বের করার ক্ষমতাই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়। বিশেষ করে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দূরপাল্লার শট বা উইং থেকে আসা নিখুঁত ক্রস ফ্রান্সের জমাট ডিফেন্সকে ভেঙে ফেলে।
ফ্রান্সের সাইড বেঞ্চ: ম্যাচের শেষভাগে গোল শোধের জন্য দেশম আক্রমণাত্মক পরিবর্তন আনেন তবে স্পেনের মিডফিল্ড তখন বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে ফ্রান্সের আক্রমণের গতি ধীর করে দেয়।
ট্যাকটিক্যাল সারসংক্ষেপ
বৈশিষ্ট্য
স্পেন
ফ্রান্স
মূল দর্শন
পজিশন ও হাই-প্রেস
কমপ্যাক্ট ডিফেন্স ও কাউন্টার
প্রধান শক্তি
উইঙ্গারদের গতি ও রদ্রি’র গেম কন্ট্রোল
কান্তে-চুয়ামেনির সেন্ট্রাল ব্লক ও এমবাপ্পের গতি
দুর্বলতা
হাই-লাইনের কারণে কাউন্টার অ্যাটাকের ঝুঁকি
বল পজিশন ধরে রেখে আক্রমণ তৈরিতে ঘাটতি
স্পেনের প্রোগ্রেসিভ এবং নির্ভীক ফুটবল অন্যদিকে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ নিটোল হলেও, স্পেনের তরুণ উইঙ্গারদের ক্রিয়েটিভিটি এবং মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ফ্রান্সের কাউন্টার-অ্যাটাকিং স্ট্র্যাটেজিকে অনেকটাই নিষ্প্রভ করে দিয়েছিল।
বিশ্বকাপের ফাইনালের আগেই ফাইনাল দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। যেখানে মুখোমুখি হচ্ছে দুই বিশ্বসেরা তারকার দল। সেই লড়াইয়ে যারা জিতবে। তারাই এগিয়ে থাকবে সোনালী ট্রফির পথে! সোমবার ডালাসে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন। দলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি ম্যাচটির বড় আকর্ষণ দুই তারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথ।
২০১৮ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন ফ্রান্সকে শিরোপা জেতানোর নায়ক! তখন লামিনে ইয়ামালের বয়স মাত্র ১১ বছর। সাত বছর পর সেই ইয়ামালই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ তারকাদের একজন। এবার ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল।
যদিও বিশ্বকাপে এই প্রথম দেখা, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে এর আগে ১০ বার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। সেই লড়াইয়ে এগিয়ে ইয়ামাল। ১০ ম্যাচের মধ্যে ৮টিতেই জয় পেয়েছেন স্পেনের এই উইঙ্গার।
জাতীয় দলের হয়ে দুবার মুখোমুখি হয়েছেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে স্পেন। ওই ম্যাচে দুর্দান্ত এক গোল করেন ইয়ামাল। এক বছর পর উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও ৫-৪ ব্যবধানে জেতে স্পেন। সেবার ইয়ামাল করেন জোড়া গোল, আর এমবাপ্পেও গোলের দেখা পান।
ক্লাব ফুটবলেও জমেছে তাদের লড়াই। চ্যাম্পিয়নস লিগ, এল ক্লাসিকো, স্প্যানিশ সুপার কাপ ও কোপা দেল রের ফাইনাল—বিভিন্ন আসরে মুখোমুখি হয়েছেন দুজন। জয়ের হিসাবে ইয়ামাল এগিয়ে থাকলেও গোলসংখ্যায় এগিয়ে এমবাপ্পে। ১০ ম্যাচে ফরাসি অধিনায়কের গোল ৯টি, ইয়ামালের ৬টি।
বিশ্বকাপে দুজনের গল্পও ভিন্ন। ২০১৮ সালে ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সেই নিজের প্রথম বিশ্বকাপে স্পেনের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছেন ইয়ামাল।
ডালাসের সেমিফাইনাল তাই শুধু ফ্রান্স-স্পেনের ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, এটি বিশ্ব ফুটবলের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দুই তারকার আরেকটি বহুল প্রতীক্ষিত দ্বৈরথ। শেষ পর্যন্ত হাসবে এমবাপ্পে, নাকি ইয়ামাল-সেই উত্তর মিলবে মাঠেই।
সারা দেশে গত কয়েকদিন ধরেভারী বৃষ্টিপাত চলছে। টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রামে নগরের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি জমে জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু জেলাতে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই জেলার মানুষ। এবার বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। বর্তমানে এইডেনবার্গে রয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ দেশের অনেক এলাকা এখন বন্যাকবলিত। লাখো মানুষ পানিবন্দি। অনিশ্চয়তা ও দুর্ভাবনায় দিন পার করছে অসংখ্য মানুষ। এই বিপর্যয়ে আক্রান্ত মানুষদের সমব্যথী আমরাও।’
এছাড়া তিনি বলে গেলেন, ‘বানভাসি মানুষদের জন্য বিসিবির পক্ষ থেকে যতটুকু সহায়তা করা সম্ভব, আমরা অবশ্যই করব। আশা করি, এই দুর্যোগ দ্রুত কেটে যাবে। ততদিন পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা করি অসহায় মানুষদের পাশে থাকার ও সাধ্যানুযায়ী যতটুকু করা যায়, তা করার।’
আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশের ছোট্ট শহর কালচিন। মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের এই জনপদ থেকেই শুরু হয়েছিল জুলিয়ান আলভারেজের স্বপ্নযাত্রা। ফুটবল ছিল শুধু একটি খেলা নয়, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। খুব ছোটবেলা থেকেই আলভারেজের একটাই লক্ষ্য ছিল-একদিন পেশাদার ফুটবলার হওয়া।
অনুশীলন শেষ হওয়ার পরও তার কাজ শেষ হতো না। অন্য শিশুরা যখন বাড়ি ফিরত কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, আলভারেজ তখন কোচের কাছ থেকে কয়েকটি বল নিয়ে একাই অনুশীলন চালিয়ে যেত। কখনো দুই দিক থেকে আসা ক্রসে শট, কখনো ফ্রি-কিক, পেনাল্টি, হেড কিংবা ড্রিবলিং-সবকিছুই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করত সে। তখনও তার বয়স ১০ বছরও হয়নি।
ছোটবেলা থেকেই পেশাদারের মতো মানসিকতা
কালচিনে বেড়ে ওঠা আলভারেজের পরিবার ছিল পরিশ্রমী ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ফুটবল থেকে কোনো আয় ছিল না, ভবিষ্যতেরও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তবু সে এমনভাবে অনুশীলন করত, যেন ইতোমধ্যেই একজন পেশাদার ফুটবলার।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা ভবিষ্যতে কী হতে চাও জানতে চাইলে তার উত্তর কখনো বদলায়নি-‘আমি ফুটবলার হতে চাই।’
দুই বছর বয়স থেকেই বলের সঙ্গে বন্ধুত্ব
মাত্র দুই বছর বয়স থেকেই বড় দুই ভাই আগুস্তিন ও রাফায়েলের সঙ্গে ফুটবল স্কুলে যাওয়া শুরু করেন আলভারেজ। অন্য শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়লেও বা খেলতে না চাইলে, ছোট্ট জুলিয়ান নিজের চেয়ে বড় একটি বল নিয়ে খেলায় মেতে থাকত।
তার মা মারিয়ানা ছিলেন একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষক এবং বাবা গুস্তাভো প্রথমে কৃষিকাজ, পরে পরিবহন খাতে কাজ করতেন। বাবা-মা ব্যস্ত থাকায় দাদি টিটাই প্রায়ই তিন ভাইকে ফুটবল অনুশীলনে নিয়ে যেতেন।
ফিফা
কোচের ভবিষ্যদ্বাণী
শৈশবের কোচ রাফায়েল ভারাস একদিন মজা করেই বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটা একদিন আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করবে।” পরে সেই কথাই বাস্তবে রূপ নেয়।
চার থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত আলভারেজকে প্রশিক্ষণ দেন ভারাস। তার মতে, এত অল্প বয়সেই আলভারেজের প্রতিভা ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। শুধু গোল করাই নয়, খেলার পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ।
যে ক্লাবকে বদলে দিয়েছে আলভারেজ
শৈশবের ক্লাব ক্লাব আতলেতিকো কালচিন আজ অনেকটাই বদলে গেছে আলভারেজের সাফল্যের কারণে। রিভার প্লেট, ম্যানচেস্টার সিটি ও আতলেতিকো মাদ্রিদে তার দলবদল থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণ ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে ক্লাবটি আধুনিক ঘাসের মাঠ, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে।
ছোটবেলা থেকেই ছিলেন গোলমেশিন
শৈশবের প্রায় প্রতিটি বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন আলভারেজ। ১১-১২ বছর বয়সে একটি ম্যাচে চার গোল করার পর শেষ গোলটি করেছিলেন দুর্দান্ত এক রাবোনা শটে। সেই গোল দেখে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়, দর্শক এবং দুই দলের সমর্থকেরাও দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিলেন।
ফিফা
বড় ক্লাবের ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিল পরিবার
রিভার প্লেট, বোকা জুনিয়র্সসহ একাধিক বড় ক্লাব খুব অল্প বয়সেই আলভারেজকে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবার তাড়াহুড়া করেনি। তারা চেয়েছিল ছেলে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হোক।
অবশেষে ১৫ বছর বয়সে আলভারেজ নিজেই সিদ্ধান্ত নেন রিভার প্লেটের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার। ২০১৮ সালে কোচ মার্সেলো গায়ার্দোর অধীনে প্রথম দলে অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন থেকে আর্জেন্টিনার নির্ভরতার প্রতীক
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আলভারেজ। এরপর থেকে তিনি দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ডে পরিণত হয়েছেন।
আজও কালচিনের মানুষ তাকে নিজেদের সবচেয়ে বড় গর্ব বলে মনে করে। শহরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখন জুলিয়ান আলভারেজের মতো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
ফিফা
‘স্পাইডার’ নামের গল্প
শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার সময়ই আলভারেজের ডাকনাম হয়ে যায় ‘স্পাইডার’। মাঠে তার অবিশ্বাস্য গতি, সর্বত্র উপস্থিতি এবং প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই চাপে ফেলার ক্ষমতার কারণেই এই নাম দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেটিই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
শিকড় ভুলে যাননি আলভারেজ
বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হলেও আলভারেজ এখনও নিজের শহরে গেলে খুবই সাধারণভাবে সময় কাটান। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে নীরবে সময় কাটাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কালচিনের মেয়র ক্লদিও কাওনের বিশ্বাস, ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পরও একদিন আলভারেজ নিজের জন্মশহরেই ফিরে আসবেন। কারণ, এখানেই তার শৈশব, এখানেই জীবনের প্রথম শিক্ষা, আর এখানেই তার শিকড়।
ছোট্ট একটি শহর থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডে পরিণত হওয়া জুলিয়ান আলভারেজ প্রমাণ করেছেন-অদম্য পরিশ্রম, ধৈর্য ও স্বপ্ন থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রতিপক্ষের গতিময় ফুটবল নিয়ে সতর্ক স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তবে কৌশলে বড় কোনো পরিবর্তন না এনে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দের ফুটবলেই আস্থা রাখছেন তিনি। অতীতের দুই দেখায় ফ্রান্সকে হারানোর আত্মবিশ্বাসও যোগাচ্ছে স্প্যানিশ শিবিরকে।
এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে ফ্রান্স। গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয় নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর নকআউটের প্রতিটি ম্যাচ নির্ধারিত সময়েই জিতে সেমিফাইনালে উঠেছে তারা। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের গতিনির্ভর আক্রমণ প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, স্পেন শুরুটা করেছিল কিছুটা ধীরগতিতে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে কেইপ ভার্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করলেও পরে সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। নকআউট পর্বেও অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়নি স্প্যানিশদের।
আগামী ১৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাসে অনুষ্ঠিত হবে দুই ইউরোপীয় পরাশক্তির সেমিফাইনাল। গত তিন বছরের মধ্যে এটি হবে দুই দলের তৃতীয় লড়াই। ২০২৪ সালের ইউরো এবং ২০২৫ সালের নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে জয় পেয়েছিল স্পেন।
তবে অতীতের সেই সাফল্যকে বর্তমানের সঙ্গে মেলাতে রাজি নন দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর মতে, আগের তুলনায় ফ্রান্স এখন ভিন্ন এক দল।
স্পেন কোচ বলেন, ‘বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে ফ্রান্স সব সময়ই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। দুই বছর আগের দলের সঙ্গে বর্তমান ফ্রান্সের অনেক পার্থক্য রয়েছে। খেলার ধরন ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। আমার বিশ্বাস, দুই দলই আগের চেয়ে আরও উন্নতি করেছে।’
দে লা ফুয়েন্তের মতে, দুই দলের ফুটবল দর্শন একেবারেই আলাদা। ফ্রান্স যেখানে গতির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে স্পেনের শক্তি বলের দখল ও ছন্দময় আক্রমণে। তাই প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে চান না তিনি।
স্পেন কোচের ভাষায়, ‘ফ্রান্সের শক্তি আমরা জানি। তবে নিজেদের খেলার ধরন বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন আনব। কিন্তু নিজেদের ফুটবল খেলেই সবশেষ দুই ম্যাচে তাদের হারিয়েছি, এবারও সেই বিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামব।’
দশ বছর আগেও যদি কেউ বলতো যে ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়মিত ট্রফির দাবিদার হয়ে উঠবে, তবে তা রীতিমতো হাসির খোরাক জোগাত। কারণ, ২০১৬ সালের ইউরো কাপের শেষ ১৬-এর লড়াইয়ে পুঁচকে আইসল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল থ্রি লায়ন্সরা। তারও আগে, ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তলানিতে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছিল তারা; যেখানে কোস্টারিকার সাথে গোলশূন্য ড্র ছিল তাদের একমাত্র প্রাপ্তি।
কিন্তু আজ সময় বদলেছে। জুড বেলিংহাম এবং হ্যারি কেইনের অসাধারণ নৈপুণ্যের ওপর ভর করে ইংল্যান্ড এখন যেকোনো টুর্নামেন্টে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকে। আর এটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো বছরের জন্য নয়, বরং প্রতিটি টুর্নামেন্টের জন্যই সত্য।
সাফল্যের নতুন এক ধারাবাহিকতা
২০১৬ সালের ইউরোর পর থেকে গত পাঁচটি প্রধান টুর্নামেন্টের মধ্যে চারটিতেই অন্তত সেমিফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ ফুটবলের ইতিহাসে এটি এক অভূতপূর্ব সময়। বিশ্বমঞ্চে এই ধারাবাহিকতার রেকর্ডে ইংল্যান্ডের ওপরে আছে কেবল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স, কারণ তাদের ঝুলিতে আছে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার মতো বড় শিরোপা।
গত শনিবার অতিরিক্ত সময়ে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রেখেছে ইংল্যান্ড। এবার শেষ চারে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়ার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এই ম্যাচটিতে যদি ইংল্যান্ড চলেও যায়, তবুও বর্তমান দলটি এমনভাবে তৈরি যা ক্ষণস্থায়ী সাফল্যের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে।
অতীত ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৯৬ সালের ইউরো কাপের সময় ডেভিড ব্যাডিয়েল, ফ্রাঙ্ক স্কিনার এবং লাইটনিং সিডসের লেখা বিখ্যাত গান “থ্রি লায়ন্স”-কে ইংল্যান্ডের বাইরের মানুষ প্রায়ই অহংকার বলে উপহাস করতো। কিন্তু গানটির একটি লাইন ছিল, “England’s gonna throw it away, gonna blow it away” যা আসলে বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়েও অন্ধ আশাবাদের কথা বলত। ইতিহাস বলে, ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা কখনোই খুব সহজে সাফল্য পাননি।
এক নজরে ইংল্যান্ডের অতীত টুর্নামেন্টের খতিয়ান:
১৯৬৮ থেকে ১৯৯০ (২২ বছরের অপেক্ষা): ১৯৬৮ সালের ইউরো সেমিফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার কাছে হারার পর পরবর্তী ২২ বছর তারা কোনো সেমিফাইনাল দেখেনি। এই দীর্ঘ সময়ে তারা দুটি বিশ্বকাপ ও তিনটি ইউরো কাপের মূল পর্বেও কোয়ালিফাই করতে পারেনি।
১৯৯৬ থেকে ২০১৮ (আবারও ২২ বছরের অপেক্ষা): ১৯৯৬ সালের ইউরোর পর আবারও ২২ বছর কেটে যায় সেমিফাইনালের মুখ দেখতে। এই সময়টি ছিল হৃদয় ভাঙার গল্পে ভরা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড, ২০০৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিরুদ্ধে ওয়েইন রুনির লাল কার্ড এবং দুই ম্যাচেই ইংল্যান্ডের বিদায়।
অন্যান্য বিপর্যয়: ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে রোনালদিনহোর সেই অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিকে গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যানের পরাস্ত হওয়া কিংবা ২০০৮ সালের ইউরো কাপে কোয়ালিফাই করতেই ব্যর্থ হওয়া।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের আগের ৬৮ বছরে ইংল্যান্ড মাত্র একবার ফাইনালে (১৯৬৬) এবং তিনবার সেমিফাইনালে উঠেছিল, যার মধ্যে দুটি ছিল নিজেদের মাটিতে। এমনকি ইংল্যান্ডের তথাকথিত ‘সোনালী প্রজন্মও’ কোয়ার্টার ফাইনালের গেরো টপকাতে পারেনি।
একবিংশ শতাব্দীর নতুন ইংল্যান্ড
বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইংল্যান্ড দল এখন এমন এক ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যার কাছাকাছি আগের কোনো দল যেতে পারেনি। আজকের একজন কিশোর ইংলিশ সমর্থক তার জীবনে ইংল্যান্ডের টুর্নামেন্টের শেষ দিক পর্যন্ত খেলা ছাড়া আর কিছুই দেখেনি। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে তারা দুটি ফাইনাল এবং দুটি সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
সাবেক কোচ গ্যারেথ সাউথগেট ইংল্যান্ডকে টানা দুটি ইউরোর ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন (২০২১ সালে ইতালির কাছে টাইব্রেকারে এবং ২০২৪ সালে স্পেনের কাছে ২-১ গোলে হার)। আর এখন বর্তমান কোচ থমাস টুখেলের ওপর দায়িত্ব এসেছে দলকে সেই অধরা শিরোপার শেষ ধাপটি পার করানোর।
শুধু ছেলেদের দলই নয়, ইংল্যান্ডের মেয়েদের দলও (লায়োনেস) টানা দুটি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে এবং ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হয়েছে। আগামী দুই বছর পর নিজেদের মাটিতে ছেলেদের ইউরো কাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—ইংল্যান্ড ফুটবলের এই জয়রথ এখনই থামছে না।
চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ একের পর এক নাটকীয়তা ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়ে এবার শেষ চারে এসে পৌঁছেছে। বিশ্বমঞ্চের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট থেকে আর মাত্র দুটি জয় দূরে দাঁড়িয়ে আছে চারটি পরাশক্তি দেশ, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের এই মঞ্চে সামান্যতম ভুলেরও কোনো সুযোগ নেই। ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দলের এই হাইভোল্টেজ লড়াই নিয়ে তৈরি করা গাইডলাইনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এমবাপ্পে বনাম ইয়ামাল: ইউরোপের দুই পরাশক্তির দ্বৈরথ
ফ্রান্স বনাম স্পেন
ভেন্যু: ডালাস স্টেডিয়াম
সময়: বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত ( ১টা)
ম্যাচের মূল আকর্ষণ:
ইউরোপের অন্যতম সেরা দুটি স্কোয়াড মুখোমুখি হওয়ায় এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি ক্লাসিক ম্যাচ হওয়ার সব উপাদান নিয়ে অপেক্ষা করছে।
মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্সের সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে আবারও মূল নায়ক ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা আটে নিয়ে গেছেন তিনি, যা তাঁকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির চেয়ে মাত্র এক গোল পেছনে রেখেছে।
তবে ফ্রান্সের আসল শক্তি হলো তাদের পুরো স্কোয়াডের গভীরতা। কোয়ার্টার ফাইনালে উসমান দেম্বেলে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের গোলসংখ্যা পাঁচে নিয়ে গেছেন। এছাড়া কোচ দিদিয়ের দেশমের দলের হয়ে মাঝমাঠে দারুণ সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন মাইকেল অলিস, যিনি ৫টি অ্যাসিস্ট নিয়ে টুর্নামেন্টের শীর্ষে আছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ইউরো কাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতা স্পেনের বিরুদ্ধে এই দলীয় শক্তি ফ্রান্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে।
স্পেনের সেরা ফুটবল এখনো দেখা বাকি বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ল্যামিন ইয়ামাল এখনো বিশ্বকাপে সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাত্র একটি গোল করেছেন। এছাড়া চার গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল গত দুই ম্যাচে কোনো গোল পাননি। ফলে নকআউট পর্বে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় পেতে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ১৯ বছরে পা দিতে যাওয়া ইয়ামাল সেমিফাইনালের এই বড় মঞ্চেই নিজের প্রতিভার সবটুকু ঢেলে দেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ২০১০-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
ব্রাজিলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফ্রান্স এবার তাদের ৮ম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলবে। তাদের চেয়ে বেশি সেমিফাইনাল খেলেছে কেবল জার্মানি (১২ বার)।
স্পেন তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারার পর থেকে তারা গত ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত (২৭ জয় ও ৯ ড্র)।
বিশ্বকাপে এটি এই দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় দেখা। এর আগে ২০০৬ সালের আসরে শেষ ১৬-এর লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েও ফ্রান্স ৩-১ গোলে জিতেছিল।
২. পুরোনো শত্রুতার নতুন অধ্যায়: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ঐতিহাসিক লড়াই
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা
ভেন্যু: আটলান্টা স্টেডিয়াম
সময়: বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ১টা।
ম্যাচের মূল আকর্ষণ:
২০১৮ সালের পর এটি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। তবে থ্রি লাইন্সদের ৬০ বছর পর ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
এটি আবেগ এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠাসা এক ম্যাচ, ঠিক ৪০ বছর আগে মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা একাই ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় করেছিলেন। এবার আর্জেন্টিনার ডাগআউটে আছেন আরেক সুপারস্টার ‘নম্বর ১০’ লিওনেল মেসি। মেসি এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি, আর প্রথমবার মুখোমুখি হওয়ার জন্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের চেয়ে বড় মঞ্চ আর হতে পারে না। এই টুর্নামেন্টে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বমোট সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া মেসি বর্তমানে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে সমান ৮টি গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন।
তবে ইংল্যান্ডের দলেও আছেন তাদের নিজস্ব আইকনিক ‘নম্বর ১০’ জুড বেলিংহাম। গত দুটি নকআউট ম্যাচের প্রতিটিতেই তিনি দুটি করে গোল করেছেন, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এই কীর্তি গড়লেন। অন্যদিকে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনও সতীর্থ বেলিংহামের সমান ৬টি গোল নিয়ে দারুণ ফর্মে আছেন।
চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলই এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ ছন্দে ফুটবল খেলতে পারেনি; বরং নকআউট পর্বে কঠোর লড়াই ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে এনে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই বুধবারে থমাস টুখেলের শিষ্যদের কাছ থেকে আরও ভালো পারফরম্যান্সের দাবি থাকলেও ম্যাচটি যে একটি স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
২০১৮ সাল থেকে ইংল্যান্ড প্রধান টুর্নামেন্টগুলোতে চারবার সেমিফাইনালে উঠেছে, যা ২০১৮ সালের আগের পুরো ইতিহাসে তাদের মোট সেমিফাইনালে ওঠার রেকর্ডের সমান।
ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচে জয়লাভ করেছে, যা ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এক আসরে তাদের দীর্ঘতম জয়ের রেকর্ড।
থমাস টুখেল ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অপরাজিত রইলেন। এর আগে ১৯৬৬ সালে অ্যালফ রামসের এই একই রেকর্ড ছিল (৫ জয়, ১ ড্র)।
আর্জেন্টিনা গত চার আসরের মধ্যে তিনবার (২০১৪, ২০২২, ২০২৬) সেমিফাইনালে পৌঁছাল। ২০১৪ সালের আগে ১৯৯০ সালের পর তারা আর সেমিফাইনাল খেলতে পারেনি।