বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার থমাস মুনিয়ের সম্প্রতি ফ্রান্স ফুটবল নিয়ে একটা মন্তব্য করে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। তার দাবি মতে, ফ্রান্স ফুটবল দল বর্তমান যে অবস্থানে আছে, তাতে বাদ পড়াদের নিয়েই তিনটি একাদশ বানানো সম্ভব, যাদের প্রতিটিই বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা রাখে। বলা হচ্ছে যাদের বাদ দিয়ে ফ্রান্স এবারের বিশ্বকাপ খেলছে তাদের দাম ৪২ কোটি ইউরো। কেউ কেউ বলছেন বিশ্ব ফুটবলে ফরাসি সৌরভ চলছে ।
চলতি বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফ্রান্সের দাপুটে ফুটবলের প্রত্যাশায় ছিলেন ভক্তরা। বিশ্বকাপ শুরুর পর তাদের সে প্রত্যাশাও ছাড়িয়ে গেছে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি, মাইকেল অলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলার পারফরমেন্স।
ফরাসি ফুটবলের ভক্তরা বলছেন, দিদিয়ের দেশমের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্কোয়াডও নাকি বিশ্বকাপ জয়ের সক্ষমতা রাখে। উত্তর টা ‘না’ হলেও এটা সত্যি যে বর্তমান ফরাসী ফুটবলে যে শক্তির উদয় হয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
দশকজুড়ে একের পর এক ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে ফরাসি ফুটবলের বর্তমান যে কাঠামো তৈরী হয়েছে তার শক্তির জায়গা আসলেই অবিশ্বাস্য। ফুটবল দল ও খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য নির্ধারণকারী ওয়েবসাইট ‘ট্রান্সফারমার্কেট ডটকম’-এর হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের মূল ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া ফুটবলারদের নিয়ে যদি একটি একাদশ গড়া হয়, তবে সেই ‘বাদ পড়া’ দলের মূল্যই বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পাঁচ দলের একটি হবে। আর তার বাজারমূল্য? প্রায় ৪২ কোটি ইউরো!
ফ্রান্সের সেই ‘বাদ পড়া’ একাদশের ইউরোতে বাজারমূল্য
লুকাস শেভালিয়ে (৩ কোটি); পিয়েরে কালুলু (৩ কোটি ২০ লাখ), জেরেমি জ্যাকেট (৫ কোটি ৫০ লাখ), লেনি ইয়োরো (৫ কোটি), আদ্রিয়েন ট্রুফার্ট (২ কোটি ৫০ লাখ); বুবাকার কামারা (৪ কোটি), এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা (৫ কোটি); দিলানি বাকওয়া (২ কোটি ৮০ লাখ), সেনি মায়ুলু (৪ কোটি) বা কেফরেন থুরাম (৪ কোটি), মুসা দিয়াবি (২ কোটি ৮০ লাখ); জুনিয়র ক্রুপি (৪ কোটি)।
মোট মূল্য: ৪১ কোটি ৮০ লাখ ইউরো (গড় মূল্য: ৩ কোটি ৮০ লাখ)।
যেভাবে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স
আজকের যে ফ্রান্সকে দেখে পুরো ফুটবলবিশ্ব যেভাবে বুঁদ হয়ে থাকে, তাদের এই সাফল্যের গল্পের পেছনে লুকিয়ে আছে চার দশকের এক দীর্ঘশ্বাস। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ টানা ৪০ বছর বিশ্বমঞ্চে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছিলো ফ্রান্স। সেই সময় ব্যর্থতার গল্পে দলের পুনর্গঠনে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন তৎকালীন জাতীয় দলের ম্যানেজার জর্জ বুলোনে।
তার পরামর্শে দেশজুড়ে ক্লাব গুলোতে উন্নত ও আধুনিক ইউথ ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা হয়। ফরাসিরা যার নাম দিল ‘সেন্টার দে ফরমেশন’। এই মহাপরিকল্পনায় পূর্ণ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসে ফ্রান্স সরকার। তাদের কাছে এটা ফুটবলার তৈরির সাথে ফরাসি জাতীয় আদর্শের প্রচার এবং একই সঙ্গে বিশ্বজয়ের এক মোক্ষম রেসিপি ছিলো।
সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে আইএনএফ (ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল দু ফুটবল) ক্লেয়ারফন্টেইনের কর্মকর্তা ফ্রাঙ্ক বেনতোলিলা আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
ফ্রান্স তখনো বড় কোনো ট্রফি জেতেনি। তখনই আমাদের টনক নড়ে যে, এভাবে আর চলবে না। সম্পূর্ণ নতুন একটা বৈপ্লবিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
১৯৭৪ সালে ভিশি শহরে প্রথম সেন্টারের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় এক নতুন দিগন্ত। দেখতে দেখতে দেশজুড়ে গড়ে ওঠে মোট ১৬টি ফুটবল একাডেমি। মূল ভূখণ্ড তো বটেই, ফ্রান্সের অধীনে থাকা দূর-দূরান্তের ক্যারিবীয় বা আফ্রিকান দ্বীপ গুলো থেকেও প্রতিভাবান খুদে জাদুকরদের বাছাই করে নিয়ে আসা শুরু হয় এই একাডেমি গুলোতে।
স্বর্ণযুগের পর ফরাসি ফুটবলের অন্ধকার অধ্যায়
এই সেন্টার গুলোই ফরাসি ফুটবলারদের পেশাদার ক্যারিয়ার ও জাতীয় দলের শক্ত মেরুদণ্ড গড়ে দেয়। ১৯৮৪ সালে ফ্রান্স ইউরো আর অলিম্পিক জিতল, খেলল দু’ দুটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালও। সাফল্যর আকাশে অন্ধকার দেখা দিলো ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। টানা দু’বার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চেই কোয়ালিফাই করতে পারল না তারা!
সেই অন্ধকারের পরই ভোরের আলো ফুটল ১৯৯৮ সালে। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে এসে চার দশকের সব হিসাব এক লহমায় চুকে গেল। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরিদের সেই ‘ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বেউর’ (বহুমাত্রিক জাতি, ধর্ম ও বর্ণের নিখুঁত মিশ্রণ) দল বিশ্বজয় করে বিশ্বকে এক নতুন ফ্রান্সের বার্তা দিল।
এই বহু সাংস্কৃতিক দল যেমন ফরাসি সমাজের বদলে যাওয়া চিত্রটা ফুটিয়ে তুলেছিল, ঠিক তেমনি সফল প্রমাণ করেছিল ফেডারেশনের সেই দীর্ঘমেয়াদী যুব উন্নয়ন কর্মসূচিকে। বেনতোলিলা আবেগ তাড়িত হয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন,
ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর কোচ এইমে জ্যাকেট এই ঐতিহাসিক জয় উৎসর্গ করেছিলেন, সব অপেশাদার ক্লাব আর একাডেমিগুলোকে বলেছিলেন, ‘এটি তোমাদেরও ট্রফি।
সেই সোনালী দলের গোলরক্ষক বার্নার্ড লামাও ফরাসি ফুটবলের এই রূপান্তরকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর মতে,
আগের প্রজন্মগুলোর সাথে আমাদের তফাত ছিল একটাই। আমাদের দলের প্রতিটি ছেলে ওই একাডেমিগুলোর কঠোর শৃঙ্খলা থেকে উঠে এসেছিল। আমাদের বুকে ট্রফি জেতার একটা তীব্র ক্ষুধা ছিল। আর প্লাস পয়েন্ট? আমাদের সাথে জিনেদিন জিদানের মতো এক অতিমানবীয় জাদুকর ছিল!
১৯৯৮ সালের সেই মহাকাব্যের পর ফ্রান্সকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই যে পাইপলাইন সচল হলো, তার সুফল ধরে রেখে তারা জিতেছে ২০১৮-র বিশ্বকাপ, আর ২০০৬ ও ২০২২ সালে মাঠ ছেড়েছে রানার্সআপের গৌরব নিয়ে। আজ ফ্রান্স যে ফুটবলার তৈরির বিশ্বসেরা কারখানা, তার বীজ বোনা হয়েছিল ওই চার দশকের হতাশার জমিতেই।
ফরাসি ফুটবলের সাফল্যের রহস্য
ফরাসি ফুটবলের এই অভূতপুর্ব সাফল্যের রহস্যটা কোথায়? সাবেক তারকা গোলরক্ষক বার্নার্ড লামার মতে, উত্তরটা লুকিয়ে আছে উন্নত একাডেমি ব্যবস্থা আর অভিবাসনের এক নিখুঁত মেলবন্ধনে। লামা বলছিলেন,
আফ্রিকা, ফ্রেঞ্চ গায়ানা থেকে আসা মানুষ আমাদের দু’টি জিনিস দিয়েছে। মিউজিক আর স্পোর্টস। উসমান দেম্বেলে কিংবা দেজিরে দুয়েদের মতো নতুন প্রজন্ম কিন্তু পুরোপুরি ফরাসি। তারা এখানেই বড় হয়েছে। এদের মধ্যে সফল হওয়ার তীব্র ক্ষুধা তো আছেই, তবে সবচেয়ে বড় কথা এদের রক্তেই ফুটবল প্রতিভা আছে। আজকের আধুনিক ফুটবল যখন ছকে বাঁধা ও ‘রোবটিক’ হয়ে পড়ছে, তখন ফ্রান্সকে আলাদা করে চেনা যায় তাদের কিছু অতিমানবীয় ব্যতিক্রমী প্রতিভার কারণে। যারা একক নৈপুণ্যে যেকোনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা দুয়ের মতো ফুটবলাররা হারতে পছন্দ করেন না। শারীরিক ও টেকনিক্যাল দুই দিক থেকেই প্রতিপক্ষের রক্ষণ চুরমার করার ক্ষমতা আছে তাঁদের। এখানেই শেষ নয়, পাইপলাইনে তৈরি আছেন মাঘনাস আকলিউশ কিংবা রায়ান চেরকির মতো আরও একঝাঁক ভিন্নধর্মী প্রতিভা।
তবে এই প্রতিভাদের তৈরি হওয়ার গল্পটা শুরু হয় শৈশবেই। আইএনএফ কর্মকর্তা ফ্রাঙ্ক বেনতোলিলার ভাষায়,
এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। আমেরিকায় একটা শিশু বড় হওয়ার সময় তার হাতে বাস্কেটবল বা রাগবি বল থাকে। আর ফ্রান্সে একটা শিশু যখন হাঁটতে শেখে, তখন থেকেই তার পায়ে ফুটবল থাকে। আর এখানকার খেলার মাঠগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত।
শৈশবের সেই উন্মুক্ত মাঠ আর একাডেমির কড়া শৃঙ্খলা এই দুইয়ের মিশেলেই আজ অপ্রতিরোধ্য ‘লে ব্লুজ’রা।
ফরাসিদের ‘ সিক্রেট টেকনিক ’বিশ্বের অনেক দেশেই তো ফুটবল জনপ্রিয়, তবে ফ্রান্সের আলাদা হওয়ার কারণ কী? দীর্ঘদিনের কোচ ও স্কাউট স্টিফেন নাদোর মতে,
‘রহস্যটা হলো কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত কাঠামো আর সুশৃঙ্খল সংগঠনের এক দারুণ কম্বিনেশন। এখানে ফুটবলাররাই প্রজেক্টের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের শুধু খেলাই নয়, শিক্ষাও দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা, মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ধরে রাখতে বাচ্চাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। এই শিকড়ের টানেই বিশ্ববাজারে আজ সেরা ফুটবলার রপ্তানিকারক ফ্রান্স।
ক্লেয়ারফন্টেইনের মতো নামী একাডেমি গুলোতে স্ট্রিট ফুটবল বা রাস্তার ফুটবলের স্কিলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। সেখানে ওয়ান-অন-ওয়ান বা টু-অন-টু পজিশন গেমের ওপর প্রচণ্ড জোর দেওয়া হয়, যা বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।
তবে এই বিপ্লব এখন আর শুধু বড় একাডেমিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিভার দিক থেকে প্যারিস এখন ব্রাজিলের সাও পাওলোর সমকক্ষ। এর নেপথ্যে আছে প্যারিসের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অখ্যাত সব ব্যক্তিগত ও স্থানীয় অপেশাদার ক্লাব।
৮-৯ বছরের বাচ্চারা সেখানে প্রতিদিন খেলছে। অপেশাদার কোচরা তাদের বিকেলে হালকা নাস্তা দিয়ে হোমওয়ার্ক করান, তারপর করান কড়া ট্রেনিং। এই বাচ্চারা যেকোনো জায়গায়, যেকোনো বয়সের সাথে চাপের মধ্যে খেলে অভ্যস্ত বলেই ১২ বছর বয়সেই একেকজন এমবাপ্পের মতো তৈরি হয়ে উঠছে।
ইউরোপের ব্রাজিল
আশির দশকে ফ্রান্সকে ডাকা হতো ‘ইউরোপের ব্রাজিল’। ব্রাজিলের বাচ্চারা যেখানে দিন শুরু করে ফুটবল দিয়ে, ফরাসিরা সেখানে আগে স্কুলে যায়, পড়াশোনা শেষ করে তবেই ফুটবল মাঠে নামে। তবে ব্রাজিলের মতোই তারা প্রতিদিন প্রচুর খেলে এবং সুন্দর ফুটবল খেলে। আর নিজেদের এই চেনা ঢঙেই আজ ‘ইউরোপের ব্রাজিল’ তকমাটি সত্যি করে দেখিয়েছে ফ্রান্স।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩




















