বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সাম্প্রতিক সময়ে যে সাফল্য পেয়েছে, সেটিই এখন তাদের জন্য এক ধরনের দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে বলে মনে করেন প্রধান কোচ পিটার বাটলার।
টানা দুইবার পিটার বাটলার শিরোপা, এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার পর বাংলাদেশের সামনে এখন এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের সুযোগ এসেছে। আর সেই পরীক্ষায় বড় ব্যবধানের হারই ফুটিয়ে তুলছে বাংলাদেশের সঙ্গে এশিয়ার পরাশক্তিদের ব্যবধান কতটা।

এশিয়ান পর্যায়ের বড় দুই শক্তি উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার তিন দিন পর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষেও ৬-০ গোলে হেরেছে তারা। জাপানের ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হারের পর বাংলাদেশের প্রথম দুই ম্যাচে গোল হজমের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬। বিপরীতে নিজেদের জালে বল জড়াতে পারেনি একবারও।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানের হারটিকে কিছুটা কঠোর মনে হয়েছে পিটার বাটলার এর কাছে। “সত্যি বলতে, আমার মনে হয় ৬-০ একটু বেশি কঠিন ফল,” ম্যাচ শেষে বলেছেন বাংলাদেশ কোচ।
এক গোলের পরই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের বড় সমস্যা হিসেবে ম্যাচে গোল হজমের পর দ্রুত একের পর এক গোল খাওয়ার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন পিটার বাটলার। তার মতে, দলটি কখনো অত্যন্ত দৃঢ় ও প্রতিরোধী ফুটবল খেলতে পারে, আবার কখনো খুব দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
“আমরা এমন একটি দল, যারা একটি গোল হজম করলে তিনটি গোল হজম করে ফেলি। একের পর এক গোল হয়ে যায়। এটাই আমরা,” বলেছেন তিনি। বাংলাদেশ কোচ একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, দলের মধ্যে দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতার অভাবও রয়েছে।
“কখনো কখনো আমরা সত্যিই খুব শক্ত ও প্রতিরোধী হতে পারি। আবার অন্য সময়ে আমরা ফুটো তাঁবুর মতো, ইচ্ছেমতো গোল হজম করি,” পিটার বাটলারের ভাষায় দলের এই বৈপরীত্যই বড় দলগুলোর বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে।
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচের ফল সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। তবে বাটলারের দৃষ্টিতে এসব ম্যাচ শুধুই বড় ব্যবধানে হার নয়; বরং বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য উচ্চপর্যায়ের ফুটবলের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও।
এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান স্পষ্ট
দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত খেলছে। অলিম্পিক, এশিয়ান কাপ ও এশিয়ান গেমস—সব বড় মঞ্চেই তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ নারী ফুটবল এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভিত শক্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ধারাবাহিক সাফল্য এলেও এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে আরও অনেক জায়গায় উন্নতি প্রয়োজন।
বাটলারের মতে, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশলগত পরিপক্বতা, খেলোয়াড়দের বেঞ্চ শক্তি এবং সামগ্রিক ফুটবল অবকাঠামো, সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের আরও উন্নতি দরকার।
“এই মুহূর্তে এই পর্যায়টি আমাদের জন্য অনেক বড় একটি ধাপ,” বলেছেন পিটার বাটলার। তবে ‘বর্তমানে’ শব্দটির ওপর জোর দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ব্যবধানটি স্থায়ী নয়।
তার ভাষায়, “আমাদের অবকাঠামো নেই। এই পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে অনেক অনেক কিছু প্রয়োজন।”
সাফল্যই কি তাহলে বাংলাদেশের বাধা?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্থানের দিকে তাকালে বাটলারের মন্তব্যটি কিছুটা বৈপরীত্যপূর্ণ মনে হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় একের পর এক সাফল্য বাংলাদেশকে এশিয়ার বড় মঞ্চে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই বড় মঞ্চেই এখন দলের সীমাবদ্ধতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই কারণেই পিটার বাটলার বলেছেন, “আমরা আমাদের নিজেদের সাফল্যেরই শিকার হয়েছি।”
সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে বাংলাদেশ এখন এমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে, যাদের সঙ্গে আগে নিয়মিত খেলার সুযোগ ছিল না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আধিপত্য থেকে এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবধানটিও দৃশ্যমান হচ্ছে।
বাটলার অবশ্য এটিকে লজ্জার কিছু হিসেবে দেখছেন না।
“এই পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো ভালো আমরা নই, এটা খুবই স্পষ্ট, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দলের বিপক্ষে,” বলেছেন তিনি। তার যুক্তি, এই দলগুলো বাংলাদেশের চেয়ে অনেক আগে থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।“তারা দীর্ঘ সময় ধরে এটা করে আসছে। তারা অলিম্পিক, এশিয়ান কাপ এবং এশিয়ান গেমসে খেলেছে,” বলেছেন বাটলার।
খেলোয়াড়দের নিয়েও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বাটলারকে শুধু দলগত নয়, ব্যক্তিগতভাবেও কিছু শিক্ষা দিয়েছে। ম্যাচের আগে যেসব খেলোয়াড়ের কাছ থেকে তিনি বড় ভূমিকা আশা করেছিলেন, তাদের কয়েকজন প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। আবার যাদের কাছ থেকে এতটা প্রভাব আশা করেননি, তাদের কেউ কেউ নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন।
“এক-দুজন খেলোয়াড়, যাদের কাছ থেকে আমি আজ প্রভাব আশা করেছিলাম, তারা তা পারেনি। আবার এক-দুজন এমন খেলোয়াড় ছিল, যারা প্রভাব ফেলেছে এবং আমি আশা করিনি যে তারা এতটা আধিপত্য দেখাবে,” বলেছেন বাংলাদেশ কোচ। এ কারণেই খেলোয়াড় বাছাই ও কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি।
এবার সামনে মিয়ানমার
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে কঠিন দুই পরীক্ষার পর বাংলাদেশের সামনে এখন তুলনামূলক ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। গ্রুপ এফে নিজেদের শেষ ম্যাচে সোমবার মিয়ানমারের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
মিয়ানমার এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৫-০ গোলে হেরেছে। তবে প্রতিপক্ষকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখছেন না বাটলার। মিয়ানমারের কোচ কলিন বেলের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, দলটি সহজ প্রতিপক্ষ হবে না এবং ভালোভাবে সংগঠিত হয়েই মাঠে নামবে।
“আমি নিশ্চিত, তারা কোনোভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ হবে না। তারা ভালো দল। কলিন বেল তাদের ভালোভাবে সংগঠিত করবেন, এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই,” বলেছেন পিটার বাটলার।
ফলে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের পর বাংলাদেশের সামনে এখন নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। এ ম্যাচে শুধু ফল নয়, দলের মানসিক দৃঢ়তা ও প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পরপর দুই ম্যাচে ১৬ গোল হজম করার পর বাংলাদেশের জন্য মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ নয়। তবে বাটলার মনে করেন, বড় দলগুলোর বিপক্ষে কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
“আমরা আমাদের ক্ষত চাটব, নিজেদের ঝেড়ে-মুছে আবার শুরু করব,” এভাবেই পরবর্তী ম্যাচের প্রস্তুতির কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্য যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে এখন দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নিজেদের কাঠামো ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পিটার বাটলার এর বক্তব্যে মূলত সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সাফল্যের পরবর্তী ধাপ আর শুধু শিরোপা জেতা নয়; বরং এশিয়ার বড় দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিযোগিতা করার মতো একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল কাঠামো তৈরি করা।
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দুটি বড় হার তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্থানের বিপরীত কোনো গল্প নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ , এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে ব্যবধান কমানো।




