ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে যেন এক অপ্রতিরোধ্য ঝড় তুলেছে ফ্রান্স। আক্রমণভাগের চার তারকা – কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমানে দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার সমন্বয়ে গঠিত ফরাসি ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’ প্রতি ম্যাচেই তাদের বিধ্বংসী রূপ দেখিয় যাচ্ছে। টানা চার ম্যাচেই প্রতিপক্ষেকে উড়িয়ে দিয়ে রাউন্ড অফ সিক্সটিন বা শেষ ষোলর ম্যাচে তাদের পরীক্ষা নিয়েছিলো প্যারাগুয়ে। সেই ম্যাচটি জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করা লে ব্লুজ’রা আজ মুখোমুখি হচ্ছে মরক্কোর।
সুইডেনের বিপক্ষে বড় জয়ের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টে টানা চার ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই ফ্রান্সকে অপরাজেয় মনে হলেও, তাদের মুখোমুখি হওয়া প্রতিপক্ষদের গল্পটা একদমই উল্টো। ফ্রান্সের রক্ষণভাগের নিখুঁত স্থায়িত্ব এবং দলের মাঝমাঠের চমৎকার ভারসাম্য জয়কে সহজ করে তুলেছে। তবে ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিল সেই আক্রমণভাগই, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর কোয়ার্টেট (চারজন) হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে চলেছে।
এমবাপ্পের অতিমানবীয় রেকর্ড ও নতুন ইতিহাস

সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন বরাবরের মতোই দলের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড সুইডিশ ডিফেন্সকে নাচিয়ে ম্যাচে এক চোখধাঁধানো জোড়া গোল উপহার দেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও গোল করেন তিনি। সব মিলিয়ে এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৭টি গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট করে ‘অ্যাডিডাস গোল্ডেন বুট’-এর দৌড়ে সবার শীর্ষে আছেন তিনি।
চলতি বিশ্বকাপেই জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার করা ১৬ গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন এমবাপ্পে। সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে তার মোট গোল সংখ্যা এখন দাঁড়াল ১৯-তে! তাও মাত্র ১৯টি ম্যাচ খেলে। অর্থাৎ বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড়ে ১টি করে গোল করেছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, যেভাবে তিনি এগোচ্ছেন, তাতে বর্তমান রেকর্ডধারী লিওনেল মেসিকেও ছাড়িয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বিশ্বকাপের পারফরমেন্সে এমবাপ্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিনিয়ে ফিফাকে বলেন:
“ও অসাধারণ, ও অবিশ্বাস্য! ও এখন অভাবনীয় ফর্মে আছে এবং দলের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে। মাঠ এবং মাঠের বাইরে ও একজন প্রকৃত নেতার মতো উদাহরণ তৈরি করছে। আমাদের শুধু প্রার্থনা করতে হবে ও যেন এই ফর্মটা ধরে রাখতে পারে।”
একই সুর শোনা গেছে রিয়াল মাদ্রিদে এমবাপের সতীর্থ অহেলিয়াঁ চুয়ামেনির গলাতেও। এমবাপ্পের এই ফর্ম কি তাকে অবাক করছে? এমন প্রশ্নে চুয়ামেনি বলেন:
“আমি জানি না। ও বহু বছর ধরে বিশ্বমানের ফুটবল খেলছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ও এবং আমাদের বাকি ফরোয়ার্ডরা যখন এই স্তরে খেলে, তখন দল হিসেবে আমরা যেকোনো চমৎকার জিনিস উপহার দিতে পারি।”
অলিসে-দেম্বেলের ম্যাজিক ও বারকোলার বাজিমাত

আক্রমণভাগের বাকি তিন সদস্যও এদিন সুইডিশ রক্ষণভাগকে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে দেননি।
উসমানে দেম্বেলে

গ্রুপে নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের জয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন দেম্বেলে। এই ম্যাচে গোল না পেলেও তার পাসিং একিউরেসি বা পাসের নিখুঁততা ছিল চোখ কপালে তোলার মতো, ৯২ শতাংশ! এমবাপের প্রথম গোলটির অ্যাসিস্টও আসে তার পা থেকে। এমনকি নিজের পঞ্চম গোলটি পাওয়ার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের জন্য বল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
মাইকেল অলিসে

বায়ার্ন মিউনিখের ২৪ বছর বয়সী উইঙ্গার মাইকেল অলিসে যেন এক বিস্ময়। নিজে গোল করতে না পারলেও সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোটাকে ডালভাত বানিয়ে ফেলেছেন। টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৫টি অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন তিনি। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলের করা ঐতিহাসিক ৬টি অ্যাসিস্টের রেকর্ডের চেয়ে মাত্র ১টি অ্যাসিস্ট দূরে আছেন অলিসে। সুইডেনের বিপক্ষে তার একটি দুর্দান্ত ওভারহেড কিক পোস্টে লেগে ফিরে না আসলে হয়তো ম্যাচের সেরা গোলটি তারই হতো। লুকা দিনিয়ে তার সম্পর্কে বলেন, “ও একদম অনন্য। ও যা করছে তাতে আমরা অবাক নই। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সব ফরোয়ার্ডরাই নিচে নেমে রক্ষণভাগকেও সাহায্য করছে। পুরো দল যখন এভাবে সুসংগঠিত থাকে, তখন মাঠে খেলাটা স্রেফ আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।”
ব্র্যাডলি বারকোলা

ফ্রান্সের আক্রমণভাগের চতুর্থ পজিশনটি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। কোচ দিদিয়ের দেশম দুয়ের জায়গায় তরুণ ব্র্যাডলি বারকোলার ওপর ভরসা রাখছেন। কোচের এই আস্থা শতভাগ সফল। দলের আক্রমণাত্মক কৌশলের সাথে নিখুঁতভাবে মানিয়ে নিয়ে বারকোলা টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় গোল তুলে নিয়েছেন। ম্যাচ শেষে সাবেক লিও তারকা বারকোলা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “এদের সাথে খেলাটা অবিশ্বাস্য। আমরা জানি ওরা বিশ্বসেরা খেলোয়াড়, আর ওদের সাথে এমন একটা বোঝাপড়া তৈরি হওয়াটা দারুণ ব্যাপার। সত্যি বলতে, টুর্নামেন্টটা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এত ভালো যাবে তা আমি কল্পনাও করিনি। আশা করি এই ধারা বজায় থাকবে এবং আমি দলকে সাহায্য করতে পারব।”
পরিসংখ্যানের আয়নায় ফ্রান্সের আধিপত্য
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের ধারালো পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| ম্যাচ ও পর্যায় | প্রতিপক্ষ | ফলাফল | ফ্রান্সের গোল স্কোরার ও বিশেষত্ব |
| রাউন্ড অব ৩২ | সুইডেন | ৩-০ (জয়) | কিলিয়ান এমবাপে (২ গোল), ব্র্যাডলি বারকোলা (১ গোল) মাইকেল অলিসের ৫ম অ্যাসিস্ট। |
| গ্রুপ পর্ব | নরওয়ে | ৪-১ (জয়) | ওসমানে দেম্বেলে (৩ গোল / হ্যাটট্রিক) |
| অন্যান্য ম্যাচ | – | জয় | প্রতি ম্যাচেই ৩ বা তার বেশি গোল |
শিরোপার সুবাস
চার ম্যাচে ১৩ গোল এবং মাঠের ভেতরে প্রতিপক্ষকে নিয়ে ছেলেখেলা করা ফ্রান্সকে এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় হাই-প্রোফাইল শিরোপাপ্রত্যাশী মনে করা হচ্ছে। এটা সত্যি যে, টুর্নামেন্টের পরের ধাপগুলোতে প্রতিপক্ষের শক্তি ও লড়াইয়ের মান আরও বাড়বে। তবে বর্তমান ফরাসি ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’ যদি এই বিধ্বংসী ছন্দ ধরে রাখতে পারে, তবে বিশ্বের খুব কম দলেরই সাধ্য আছে এই ‘লে ব্লুজ’দের রুখে দাঁড়ানোর।
এবার আশাকরি আপনার মন মতো বিস্তারিত হয়েছে? কোনো তথ্য কিন্তু বাদ পড়েনি! আর কোনো মতামত বা পরিবর্তন চান?


