আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচটি রাঙিয়ে রাখল আর্জেন্টিনা। উৎসবে পরিণত হওয়া ম্যাচে বেনিনকে ৩–০ গোলে হারিয়েছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। নিজে গোল করে এবং সতীর্থদের গোলে অবদান রেখে বিদায়ের মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রেখেছেন মেসি। তবে জয় কিংবা গোলের আনন্দের মধ্যেও মেসির কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ। সুযোগ থাকলে সারা জীবনই যে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে চাইতেন, বিদায়ী বক্তব্যে সেটিই জানিয়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
বিদায়ী ম্যাচে মেসির বক্তব্য,“এই জার্সিকে ধন্যবাদ। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে, এমনকি সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি লড়াই থামাইনি, সামনে এগিয়ে যাওয়া বন্ধ করিনি। আমার যা কিছু ছিল, সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। আমি সবসময় এখানে থাকতে চেয়েছি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলতে না পারাটা আমাকে অনেক বেশি কষ্ট দেবে। যদি আমার হাতে থাকত, তাহলে আমি সারা জীবন এখানে খেলতে চাইতাম। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার।
“আমার মনে হয়, আজ আমি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। কারণ আমি চাই না এই মুহূর্তটা শেষ হয়ে যাক। “তবে আমার মনে হয়, এবার আমার অবসর নেওয়ার সময় এসেছে। গত বিশ্বকাপে আমরা অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছি। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আমরা ফাইনালে উঠেছিলাম এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছি, ঠিক যেভাবে সবসময় করে এসেছি।
“আমরা আবারও জেতার খুব কাছাকাছি ছিলাম। আমাদের নিয়ে যা বলা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তেমন অদ্ভুত কিছুই ঘটেনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় করেছিল, কারণ সেখানে আমরা নিজেদের সবটুকু দিয়েছিলাম।
“২০২২ সালে আমাদের শুধু আমার নিজের স্বপ্ন নয়, পুরো একটি দেশের স্বপ্ন পূরণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল, আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আমরা সেটি করে দেখিয়েছিলাম। “আমরা বিশ্বকাপ জিতেছি, কোপা আমেরিকা জিতেছি, ফিনালিসিমা জিতেছি। এই জাতীয় দলের সঙ্গে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সবকিছুর জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ।
“তবে এই যাত্রা শুধু ২০২২ কিংবা শেষ বিশ্বকাপকে ঘিরে নয়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনেক আগে থেকেই অসংখ্য সতীর্থ এই জার্সির জন্য আমার পাশে লড়াই করেছে। আর্জেন্টিনার জন্য তারা কতটা লড়াই করেছে এবং নিজেদের কতটা উজাড় করে দিয়েছে, তা নিয়ে কখনো কোনো সন্দেহ ছিল না।
“আমার সব সতীর্থের সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করতে পারা এবং ফুটবলের বাইরে জীবনের এত বড় একটা সময় একসঙ্গে কাটানো ছিল সৌভাগ্য ও সম্মানের। প্রতিবার মাঠে নামার সময় আমি জানতাম, আমরা যেকোনো দলের বিপক্ষে লড়াই করতে পারি। কারণ আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা ছিল, যারা মাঠে নিজেদের সবটুকু দিতে প্রস্তুত ছিল।
“বড় অর্জন পেতে হলে একটি শক্তিশালী দলের প্রয়োজন। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেই বোঝা যায়, একটি দল আসলে কেমন। আমরা যা কিছু অর্জন করেছি, তার অন্যতম বড় কারণ এটাই। “বিশেষ করে এই দলকে ধন্যবাদ। তারা আমাকে ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। তারা আমাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছে।
“আমি আর্জেন্টিনার মানুষদেরও ধন্যবাদ জানাতে চাই। দেশের অনেক শহরে খেলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং যেখানেই গিয়েছি, অবিশ্বাস্য ভালোবাসা পেয়েছি। “এত বছর ধরে পৃথিবীর যেখানেই আমরা খেলেছি, স্টেডিয়ামগুলো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দিয়ে পূর্ণ ছিল। ম্যাচ যেমনই হোক কিংবা দূরত্ব যতই হোক, মানুষ সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা জানি, সেটি কতটা কঠিন। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছি, মনে হয়েছে আমরা নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি। কারণ সবসময় আপনাদের সমর্থন অনুভব করেছি।
“এই সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। কঠিন সময় আসবে, আর তখন দলকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমর্থন করতে হবে। আপনাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ একটি দল প্রয়োজন। কারণ সবসময় এমন কিছু মানুষ থাকবে, যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই সুযোগ দিতে পারি না।
“এই স্টেডিয়ামেই আমি জীবনের অন্যতম আনন্দের একটি দিন কাটিয়েছি, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঘরের মাঠে খেলা আমাদের প্রথম ম্যাচটি। সেটি ছিল অসাধারণ। আর আজকের দিনটি হয়তো আমার সবচেয়ে দুঃখের দিনগুলোর একটি, কারণ আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে বিদায় নিচ্ছি। “আমি আপনাদের সবাইকে খুব মিস করব। তবে সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। আমি এই ছেলেদের এবং এরপর যারা আসবে, তাদের সবাইকে সমর্থন করে যাব।
“এই মুহূর্তে আমার ভেতর দিয়ে আবেগের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিতভাবেই এমন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি, যা বলতে চেয়েছিলাম। কারণ এটি আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি মুহূর্ত। সবার আগে যার কথা আমার মনে আসছে, তিনি হলেন আমার বাবা। “এখানে খেলতে না পারাটা আমি খুব মিস করব। আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি এবং একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।
“আমি কৃতজ্ঞতা, গর্ব ও শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।”




