জাতীয় দলের ফুটবল ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহ বাড়লেও ঘরোয়া ফুটবলের অবকাঠামো, মাঠের মান ও সম্প্রচার নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ কাটেনি। সেই চিত্র বদলাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ঘরোয়া লিগের মান বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হাইব্রিড মডেলে লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে দেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এ লক্ষ্যে শনিবার বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে বাফুফে।
বাফুফে ভবনে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সংস্থাটির সহসভাপতি ফাহাদ করিম জানান, শুরুতে বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপ ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক দল নিয়ে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে বাফুফে সভাপতি দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেন। সেই ভাবনা থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।
ফাহাদ করিম বলেন, ঘরোয়া ফুটবলের মানোন্নয়নই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তবে এই সমঝোতার মাধ্যমে বাফুফে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সুপার লিগ (বিএসএল) আয়োজন করতে বাধ্য নয়। একই সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও আলোচনা কিংবা সমঝোতা করার সুযোগ থাকছে।
ছয় মাসের মধ্যে পরিকল্পনা জমা
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত লিগ আয়োজনের বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করে বাফুফের কাছে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পটির আর্থিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরির কাজ করবে তারা।
ফাহাদ করিমের ব্যাখ্যা, বাফুফের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা থাকলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। সে কারণেই এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তবে লিগ আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।
শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়, বদলাতে চায় পুরো কাঠামো
বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপের নির্বাহী চেয়ারম্যান নাজির রহমান জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য কেবল ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক দল গঠন নয়; বরং দেশের ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করা। মাঠের মান, সম্প্রচারব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা আয়োজনের অন্যান্য দিকেও গুরুত্ব দিতে চান তাঁরা।
নাজির রহমানের দাবি, তাঁদের সঙ্গে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে, যারা কাতার বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এ ছাড়া ফুটবলে বিনিয়োগে আগ্রহী আরও কিছু কোম্পানির সঙ্গেও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে দর্শকদের বিপুল আগ্রহ থাকলেও ঘরোয়া ফুটবলে সেই আগ্রহকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। ক্লাবগুলোকে দল পরিচালনা করতে আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। এ অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে অর্থ বিনিয়োগ করে কতটা লাভবান হবেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
জবাবে নাজির রহমান বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ ও বাজারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রতি মানুষের সমর্থন, জার্সির চাহিদা এবং ফুটবলকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ প্রমাণ করে, দেশে ফুটবলের একটি বড় বাজার রয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও এই সম্ভাবনা অজানা নয়। তবে ব্যবসায় বিনিয়োগের সঙ্গে লাভ-ক্ষতির ঝুঁকি থাকবেই, আর সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত তাঁদের প্রতিষ্ঠান।
প্রিমিয়ার লিগের ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে বাংলাদেশের শীর্ষ ফুটবল লিগে ১৩টি দল অংশ নেয়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় চার-পাঁচটি দল নিয়ে বাংলাদেশ সুপার লিগ আয়োজনের চিন্তা রয়েছে। কিন্তু এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে বর্তমান লিগের অন্য দলগুলোর অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে বাকি ছয়-সাতটি ক্লাব কোন প্রতিযোগিতায় খেলবে, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লিগের মর্যাদা কোন টুর্নামেন্ট পাবে এবং ক্লাবগুলোর মধ্যে পদোন্নতি-অবনমনের ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়।
ফাহাদ করিম জানান, লিগের কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাফুফের লিগ কমিটি ও নির্বাহী কমিটির আলোচনা এবং অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাশাপাশি ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) নির্দেশনা অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের ফুটবলের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) চালুর সময় সেটি দেশটির শীর্ষ লিগ ছিল না। পরবর্তী সময়ে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেটি ভারতের প্রধান লিগে পরিণত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে লিগের কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠবে, তা আলোচনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
আগেও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের উদ্যোগ থমকে গেছে
বাংলাদেশের ফুটবলে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের চিন্তা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগে সাইফ পাওয়ারটেক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে লোগো উন্মোচন করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়ায়নি সেই প্রতিযোগিতা।
এ ছাড়া নারী ফুটবলে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের উদ্যোগও একসময় আলোচনায় এসেছিল। দল ও লোগো পরিচিতির মতো প্রাথমিক কার্যক্রমের পরও সেটি বাস্তব রূপ পায়নি।
অতীতের এসব অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে। পরিকল্পনা ঘোষণা করা আর নিয়মিত ও টেকসই একটি লিগ চালু করা এক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, স্পষ্ট পরিচালন কাঠামো, ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণ এবং দর্শক-সমর্থকদের আগ্রহ ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা।
ফাহাদ করিমও স্বীকার করেছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। তারপরও ঘরোয়া ফুটবলের উন্নয়নে চেষ্টা চালিয়ে যেতে চান তাঁরা। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে আগামী ছয় মাসের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্যোগের ওপর।
২০৪৪ অলিম্পিকের স্বপ্নও দেখছে প্রতিষ্ঠানটি
ফুটবল ছাড়াও বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপের। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগে স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাবনাও তাঁদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
নাজির রহমানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২০৪৪ সালের অলিম্পিক আয়োজনের জন্য বাংলাদেশকে বিড করানো। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
তবে অলিম্পিক আয়োজনের মতো বড় দায়িত্ব নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া সুবিধা এবং আয়োজনের সক্ষমতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। এশিয়ান গেমসের মতো বহুক্রীড়ার আসর আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, বাফুফে ও বাংলাদেশ স্পোর্টস পার্টনারশিপের সমঝোতা ঘরোয়া ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং দেশের বিদ্যমান ক্লাব কাঠামোর সঙ্গে নতুন মডেলের সমন্বয়ের ওপর। ছয় মাসের মধ্যে জমা পড়তে যাওয়া পরিকল্পনাই দেখাবে, হাইব্রিড লিগের ভাবনা বাস্তব ফুটবলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।


