মিয়ানমারকে রুখে দিয়েও গ্রুপ পর্বেই বিদায় বাংলাদেশের

গোলশূন্য ড্রয়ে এশিয়ান গেমস শেষ বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের, দুই কোরিয়ার কাছে বড় হারের পর শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের বিপক্ষে লড়াই করেও মিলল না জয়

এশিয়ান গেমসে এবারও গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে পারল না বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে নিজেদের শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে প্রতিযোগিতা শেষ করেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সোমবার ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দুই দলই গোলের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো দলই জালের দেখা পায়নি।

মিয়ানমারের বিপক্ষে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নেওয়ায় গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সংগ্রহে যোগ হলো এক পয়েন্ট। তবে আগের দুই ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের কারণে শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে কোচ পিটার বাটলারের দলকে।

দুই কোরিয়ার কাছে বড় হারেই কঠিন হয়ে যায় সমীকরণ

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের এবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। প্রথম ম্যাচেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে বাংলাদেশ। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ১০-০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

প্রথম ম্যাচের পর দ্বিতীয় ম্যাচেও কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও বড় ব্যবধানে হারতে হয় তাদের। দক্ষিণ কোরিয়া ৬-০ গোলে বাংলাদেশকে পরাজিত করে।

পরপর দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারের ফলে গ্রুপের শেষ ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় পেলে তৃতীয় দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। সেই সমীকরণ সামনে রেখেই মাঠে নামে বাংলাদেশ।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত জয় আর পাওয়া হয়নি।

মিয়ানমারের বিপক্ষে ভিন্ন চেহারায় বাংলাদেশ

দুই কোরিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর মিয়ানমারের বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে ছিল লড়াইয়ের ছাপ। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৫২ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারের বিপক্ষে ম্যাচের আগে স্বাভাবিকভাবেই কঠিন লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল।

তবে মাঠে নামার পর বাংলাদেশ নিজেদের সংগঠিত রাখে। অধিনায়ক মারিয়া মান্দার নেতৃত্বে দলের খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলানোর পাশাপাশি নিজেদের আক্রমণ তৈরিরও চেষ্টা করেন।

ম্যাচের পুরোটা সময় মিয়ানমারকে খুব বেশি স্বাধীনভাবে খেলতে দেয়নি বাংলাদেশ। মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে বাংলাদেশও নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। ফলে আগের দুই ম্যাচের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বাংলাদেশকে দেখা যায়।

বল দখলে প্রায় সমানে সমান

মিয়ানমারের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ ৪৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ বল নিয়ন্ত্রণে দুই দলের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য ছিল না।

তবে শুধু বল দখল করলেই সুযোগ তৈরি হয় না—আক্রমণের শেষ ধাপে কার্যকর হওয়ার জায়গায় পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষের গোলমুখে বাংলাদেশের হয়ে ঋতুপর্ণা চাকমা ও তহুরা খাতুনরা মোট তিনটি শট নেন। কিন্তু এর কোনোটি মিয়ানমারের গোলরক্ষককে বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি এবং একটি শটও লক্ষ্যে ছিল না।

অন্যদিকে মিয়ানমার আক্রমণে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ছিল। তারা মোট আটটি শট নেয়, যার দুটি ছিল লক্ষ্যে। তবে বাংলাদেশের গোলরক্ষক রুপনা চাকমা দুটিই দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করেন।

রুপনা চাকমার দৃঢ়তায় গোলশূন্য ড্র

ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। মিয়ানমারের আক্রমণ থেকে আসা দুটি লক্ষ্যভিত্তিক শট তিনি সফলভাবে রুখে দেন।

বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন গোলের জন্য চাপ তৈরি করছিল, তখন রুপনার দৃঢ়তা বাংলাদেশকে ম্যাচে টিকে থাকতে সহায়তা করে। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেভগুলোও ম্যাচের স্কোরলাইন গোলশূন্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের আক্রমণভাগ অবশ্য মিয়ানমারের রক্ষণভাগকে সেভাবে বিপদে ফেলতে পারেনি। ফলে একদিকে রুপনা নিজের গোলপোস্ট অক্ষত রাখলেও অন্যদিকে বাংলাদেশের আক্রমণ থেকে গোল না আসায় জয়ও অধরা থেকে যায়।

জয়ের প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের

মিয়ানমারের বিপক্ষে শুধু ড্র বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আগের দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারের পর কোয়ার্টার ফাইনালের ক্ষীণ সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে শেষ ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু গোলশূন্য ড্রয়ে সেই সমীকরণ আর পূরণ হয়নি। ফলে মিয়ানমারের বিপক্ষে একটি পয়েন্ট পেলেও গ্রুপ পর্ব পেরোনোর সুযোগ হারায় বাংলাদেশ।

শেষ ম্যাচে অন্তত পরাজয় এড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ। তবে টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত দলের অবস্থান নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলেছে।

দ্বিতীয়বার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের নারী দল

এশিয়ান গেমসে এটি বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের দ্বিতীয় অংশগ্রহণ। এর আগে ২০২৩ সালের আসরেও অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ।

২০২৩ সালের আসরে তিনটি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ দুটি ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল এবং একটি ম্যাচ ড্র করেছিল। সেই আসরে মোট ১৫টি গোল হজম করেছিল দলটি।

এবারের আসরেও গ্রুপ পর্বেই শেষ হলো বাংলাদেশের যাত্রা। প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬-০ গোলে হারের পর শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে দলটি।

ফলে এবারের তিন ম্যাচে বাংলাদেশ মোট ১৬টি গোল হজম করেছে এবং কোনো গোল করতে পারেনি।

শেষ ম্যাচে ইতিবাচক বার্তা

যদিও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে, মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র বাংলাদেশের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও সামনে এনেছে। বিশেষ করে দুই কোরিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারের পর তুলনামূলক শক্তিশালী মিয়ানমারের বিপক্ষে নিজেদের গোলপোস্ট অক্ষত রাখা দলের রক্ষণভাগের উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

৪৮ শতাংশ বল দখল, প্রতিপক্ষের আটটি শটের বিপরীতে বাংলাদেশের তিনটি শট এবং মিয়ানমারের দুটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে হলে আক্রমণভাগে সুযোগ তৈরি এবং সেগুলোকে গোলে পরিণত করার জায়গায় উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। মিয়ানমারের বিপক্ষে তিনটি শট নিয়েও কোনোটি লক্ষ্যে না থাকা বিষয়টিও সেই জায়গাটিই সামনে এনেছে।

গ্রুপ পর্বেই থামল বাংলাদেশের যাত্রা

শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে এশিয়ান গেমসের এবারের মিশন শেষ করল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। প্রথম দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর শেষ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত জয় পাওয়া সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারকে গোল করতে না দিয়ে বাংলাদেশ অন্তত একটি পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়লেও সেটি কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জন্য যথেষ্ট হয়নি। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে এবারও গ্রুপ পর্বেই থামতে হলো বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে।

এখন এই আসরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে আরও শক্তিশালী প্রস্তুতি নিয়ে ফিরতে হবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। বিশেষ করে রক্ষণভাগের সংগঠন, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভাগের ফিনিশিং, এই তিন জায়গায় উন্নতি করতে পারলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles