আয় ও আকারের পর এবার দূষণেও রেকর্ড , আয়োজন আর আয়ের দিক থেকে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ৩২টি দলের পরিবর্তে এবার লড়ছে ৪৮টি দল, আর ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০৪টি। ফুটবলকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং অন্তত ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যে ফিফা এই বেনজির সম্প্রসারণ করলেও, টুর্নামেন্টটি পরিবেশের ওপর এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে বলে সতর্ক করছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, এবার কার্বন দূষণেও এক নতুন নেতিবাচক বিশ্বরেকর্ড গড়তে যাচ্ছে এই মেগা আসর।

৯০ লক্ষ টন কার্বন নির্গমনের আশঙ্কা: মূল খলনায়ক ‘বিমান ভ্রমণ’
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হওয়া এই বিশ্বকাপের ভেন্যু গুলোর মধ্যকার বিশাল দূরত্বই পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তর প্রান্তের কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে শুরু করে দক্ষিণ প্রান্তের মেক্সিকো সিটি – এই দুই ভেন্যুর মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। বাকি স্টেডিয়াম গুলোর গড় দূরত্বও দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটারের কম নয়।
এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিতে দর্শক, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের একমাত্র ভরসা বিমান। আর এই বিমান ভ্রমণের কারণেই সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়াচ্ছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, পুরো টুর্নামেন্টে সম্ভাব্য ৯০ লক্ষ টন কার্বন নির্গমনের মধ্যে প্রায় ৭৭ লক্ষ টনই আসবে কেবল এই আকাশপথের যাতায়াত থেকে।
ফিফার পরিবেশ নীতি বনাম বাস্তবচিত্র
২০২১ সালে ফিফা ঘোষণা করেছিল যে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ‘নেট-জিরো’ বা শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে। তবে সমালোচকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফিফার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়। উপরন্তু, ফিফার এই নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা মূলত তাদের নিজস্ব অফিস এবং প্রশাসনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বিশ্বকাপের মতো বিশাল টুর্নামেন্টকে এই হিসেবের বাইরেই রাখা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিগত বিশ্বকাপ গুলোর তুলনায় এবারের দূষণ মাত্রাতিরিক্ত। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ২২ লক্ষ টন এবং ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ২১ লক্ষ টন কার্বন নির্গমন হয়েছিল। এমনকি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও এই পরিমাণ ছিল ৫২ লক্ষ টন। অথচ এবার তা এক লাফে ৯০ লক্ষ টনে গিয়ে ঠেকছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও এসি ব্যবহারের ধুম
কার্বন নির্গমনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক শহর গুলোর প্রতিকূল আবহাওয়া পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ডালাস, হিউস্টন এবং আটলান্টার মতো শহর গুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। এই বৈরী আবহাওয়ায় খেলোয়াড় ও দর্শকদের স্বস্তি দিতে স্টেডিয়াম গুলোতে উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন এয়ার কন্ডিশনিং (এসি) ব্যবস্থা চালু রাখতে হচ্ছে। ফলে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে পরোক্ষ দূষণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
প্লাস্টিক বর্জ্যের বড় হুমকি
এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ হলো ‘সিঙ্গেল ইউজ’ বা একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক। শুরুতে ফিফা স্টেডিয়ামের ভেতরে পুনর্ব্যবহার যোগ্য জলের বোতল নিয়ে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরিবেশ কর্মীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। পরিবেশ বিদদের মতে, প্রতিটি ম্যাচে লাখ লাখ দর্শক যদি একবার ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করেন, তবে টুর্নামেন্ট শেষে যে বিশাল প্লাস্টিক বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হবে, তা প্রকৃতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
আর্থিক মুনাফা এবং ফুটবলের প্রচার বাড়লেও, ধরিত্রীর সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এমন মেগা ইভেন্ট আয়োজন কতটুকু যৌক্তিক, এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩





















