ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক, এবার খেললেন ফ্রান্সেরই বিপক্ষেই

ফুটবল বিশ্ব কতশত নাটকীয়তার জন্ম দেয়, কিন্তু একই বছরের ব্যবধানে এক দেশের বয়সভিত্তিক দলের অধিনায়ক থেকে অন্য দেশের হয়ে সাবেক দলের বিপক্ষে মাঠে নামার ঘটনা সত্যিই বিরল। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স বনাম মরক্কোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে ঠিক তেমনই এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো পুরো বিশ্ব। মাত্র কয়েক মাস আগে যে ফুটবলার ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২১ দলের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিলেন, তিনিই এবার মাঠে নামলেন সেই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে।

তিনি আর কেউ নন, ফরাসি ক্লাব লিলের তরুণ মিডফিল্ড সেনসেশন আইয়ুব বুয়াদ্দি ।

ফরাসি ফুটবলের ভবিষ্যৎ থেকে মরক্কোর ‘অ্যাটল্যাস লায়ন’

আইয়ুব বুয়াদ্দির জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে হলেও তার ধমনিতে বইছে মরক্কোর রক্ত। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬ দল থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ দল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই তিনি ছিলেন ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিভা। এমনকি চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই ইউরো ২০২৮-এর বাছাইপর্বে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ফরাসি ফুটবল ভক্তরা তাকে দেখছিলেন জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ কান্ডারি হিসেবে।

তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে অফিসিয়াল ম্যাচ না খেলা পর্যন্ত যেকোনো ফুটবলার তার মূল জাতীয় দল পরিবর্তন করতে পারেন। ফ্রান্সের সিনিয়র দলে ডাক পাওয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেই মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন বুয়াদ্দিকে তাদের প্রজেক্টের মূল অংশ হিসেবে প্রস্তাব দেয়। নিজের শিকড়ের টানে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের নীল জার্সি ছেড়ে মরক্কোর লাল-সবুজ জার্সি বেছে নেন এই তরুণ তুর্কি।

মাত্র ১০১ দিনের ব্যবধানে ঐতিহাসিক দ্বৈরথ

ফুটবলের ভাগ্যলিপি বোধহয় এভাবেই লেখা হয়। মরক্কো জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার মাত্র ১০১ দিনের মাথায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স।

গতকালকের ম্যাচে যখন দুই দল মাঠে নামে, তখন গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের জন্য এটি ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য। যে সতীর্থদের সাথে মাত্র কয়েক মাস আগে ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন, ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছেন, বুয়াদ্দিকে আজ লড়তে হয়েছে তাদেরই বিরুদ্ধে। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে বা অরেলিয়েন চুয়ামেনির মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডারদের রুখে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তারই কাঁধে।

“ফুটবলে পেশাদারিত্বই শেষ কথা। ফ্রান্সের প্রতি আমার সম্মান সবসময় থাকবে, কারণ ওখানেই আমার ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠা। তবে আজ আমি মরক্কোর হয়ে মাঠে নেমেছি এবং আমার দেশের জন্য জানপ্রাণ লড়েছি।” — ম্যাচ শেষে আইয়ুব বুয়াদ্দি

বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড়

ম্যাচটি কেবল একটি কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি রূপ নিয়েছিল বুয়াদ্দির ব্যক্তিগত আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মঞ্চে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের টেবিলে এখন একটাই আলোচনা, জাতীয়তা ও ফুটবলের এই রোমাঞ্চকর দোলাচল।

একই বছরে এক দেশের অধিনায়ক থেকে অন্য দেশের হয়ে সাবেক দেশের বিরুদ্ধে খেলা এই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। বুয়াদ্দির এই গল্প প্রমাণ করে, আধুনিক ফুটবলে সীমান্তের চেয়েও খেলোয়াড়দের আবেগ এবং শিকড়ের টান কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles