বাবার অসুস্থতার চিন্তায় বিশ্বকাপেও কেঁদেছিলেন মেসি

একদিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিকের আনন্দ, অন্যদিকে বাবার অসুস্থতার দুশ্চিন্তা, দুই বিপরীত অনুভূতি একসঙ্গে বয়ে বেড়িয়েছিলেন লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল করার পর আর্জেন্টাইন তারকার চোখে দেখা গিয়েছিল অশ্রু। তখন অনেকের কাছেই সেটি ছিল বিস্ময়ের। পরে জানা যায়, সেই কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির অসুস্থতার বিষয়টি।

আজ সেই বাবাই আর নেই। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর ৬৮ বছর বয়সে রোজারিওর একটি মেডিকেল ক্লিনিকে মারা গেছেন হোর্হে মেসি। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিশ্বকাপ চলার সময় হোর্হের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যেও দেশের হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর গোল উদযাপনের সময় হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। চোখের পানি মুছতে দেখা যায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে।

ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে মেসিকে তাঁর কান্নার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এর সঙ্গে মাঠের কোনো ঘটনা জড়িত নয়। বরং পরিবারকে ঘিরে তখন কঠিন একটি সময় পার করছিলেন তিনি। পরে মেসির পরিবারও হোর্হের শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি প্রকাশ করে এবং জানায়, তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বিশ্বকাপের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর বাবার কাছে ছুটে যান মেসি। রোজারিওতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ইন্টার মায়ামির হয়ে মাঠে নামেন তিনি। কিন্তু বাবার অসুস্থতার বিষয়টি যে তাঁর মনে কতটা প্রভাব ফেলেছিল, সেটি বোঝা যায় সেই সময়ের ঘটনাগুলোতেই।

মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে ওঠার পেছনে হোর্হে মেসির অবদান ছিল বিশাল। ছোটবেলা থেকেই ছেলের প্রতিভাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মেসির ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন হোর্হে।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসিকে নিয়ে স্পেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেই যাত্রার পরই বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় মেসির নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসেন আর্জেন্টাইন তারকা।

বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের গভীরতা একাধিকবার প্রকাশ করেছেন মেসি। ছোটবেলায় প্রতিটি ম্যাচের পর বাবার মতামত জানতে চাইতেন তিনি। মেসির ভাষায়, বাবার কাছ থেকে ভালো খেলার স্বীকৃতি পাওয়া তাঁর কাছে সবসময়ই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাই বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের পর মেসির সেই কান্নাকে এখন অন্যভাবেও দেখা যায়। গোলের আনন্দের মুহূর্তেও প্রিয় বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। মাঠের উচ্ছ্বাসের আড়ালে তখন লুকিয়ে ছিল পরিবারের জন্য এক গভীর উদ্বেগ।

হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর শোক জানিয়েছে মেসির শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজও। ক্লাবটির সঙ্গে মেসির বেড়ে ওঠার সময় হোর্হের অবদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ফুটবলে মেসির অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। বিশ্বকাপ, অসংখ্য শিরোপা, রেকর্ড আর ব্যক্তিগত পুরস্কারে ভরা তাঁর ক্যারিয়ার। কিন্তু বাবাকে ঘিরে বিশ্বকাপের সেই অশ্রুসিক্ত মুহূর্তটি হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে। কারণ সেই কান্নার পেছনে ছিল এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু তাঁর বাবা নন, ছিলেন তাঁর স্বপ্নযাত্রার অন্যতম প্রধান সহযাত্রী।

spot_imgspot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles