সেমিফাইনালে হার জিন্নাতের, কাল গলায় উঠবে ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ

স্বর্ণ কিংবা রুপার লড়াইয়ে ওঠা হলো না বাংলাদেশের উশু কন্যা জিন্নাত আক্তারের। তবে হারলেও ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে ফেলেছেন নেত্রকোনার ২৩ বছর বয়সী এই তরুণী। আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে মেয়েদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির সেমিফাইনালে চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিযোগী উ দির কাছে হেরে গেছেন জিন্নাত। তাতে অবশ্য থেমে যায়নি তার অর্জন, সেমিফাইনালে ওঠার আগেই নিশ্চিত হয়েছিল ব্রোঞ্জ পদক।

আগামীকাল ফাইনাল শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে জিন্নাতের গলায় উঠবে এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদক। আর সেই পদকের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসেও যুক্ত হবে নতুন একটি অধ্যায়। কারণ দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর এশিয়ান গেমসের ব্যক্তিগত ইভেন্টে আবারও পদক জিততে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

সেমিফাইনালে থামলেন জিন্নাত

আজ মেয়েদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণির সেমিফাইনালে শুরু থেকেই কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন জিন্নাত। তার প্রতিপক্ষ চীনের উ দি বিশ্বমানের শীর্ষস্থানীয় প্রতিযোগীদের একজন। প্রথম রাউন্ডের দুই মিনিটের লড়াইয়ে ১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর্যন্ত টিকে ছিলেন বাংলাদেশের এই উশু খেলোয়াড়। এর মধ্যে দুবার পড়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪-০ পয়েন্টে জয় পান চীনের প্রতিযোগী।

প্রতিপক্ষের এগিয়ে যাওয়ার কারণে পরের দুই মিনিটের আর প্রয়োজন হয়নি। ফলে সেমিফাইনালেই থেমে যায় জিন্নাতের স্বর্ণ কিংবা রুপার স্বপ্ন। তবে পরাজয়ের মধ্যেও তার জন্য অপেক্ষা করছে ঐতিহাসিক অর্জন। কারণ এই ইভেন্টে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী কোনো ম্যাচ নেই। দুই সেমিফাইনালের পরাজিত দুই প্রতিযোগীকেই ব্রোঞ্জ পদক দেওয়া হবে।

৪০ বছর পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক

জিন্নাতের এই ব্রোঞ্জ শুধু তার নিজের অর্জন নয়, বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস ইতিহাসেও এটি বিশেষ এক মাইলফলক। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সাল থেকে এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ক্রিকেট ও কাবাডির মতো দলীয় ইভেন্টে দেশের সোনা ও রুপার পদক রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের পদক ছিল মাত্র একটি।

১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্যক্তিগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। সেটিই এতদিন ছিল এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তিগত পদক। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। অনেক অ্যাথলেট, অনেক সম্ভাবনা এবং বহু প্রতিযোগিতার পরও ব্যক্তিগত ইভেন্টে আর কোনো বাংলাদেশি অ্যাথলেট পদকের দেখা পাননি।

অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন জিন্নাত আক্তার।

রিংয়ে না নেমেই কোয়ার্টার ফাইনাল পার

এবারের এশিয়ান গেমসে জিন্নাতের পদক নিশ্চিত হওয়ার পথটিও ছিল বেশ নাটকীয়। মেয়েদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে অংশ নেন মোট ১৫ জন প্রতিযোগী। প্রথম রাউন্ডে বাই পাওয়ায় সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেন জিন্নাত।

কোয়ার্টার ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা ছিল ইন্দোনেশিয়ার তারিসা দিয়া ফ্লোরেন্তিনা। কিন্তু নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি ওজন হওয়ায় প্রতিযোগিতা থেকে ডিসকোয়ালিফাইড হন ফ্লোরেন্তিনা।

ফলে কোনো লড়াইয়েই নামতে হয়নি জিন্নাতকে। রিংয়ে না নেমেই কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ী ঘোষণা করা হয় তাকে। আর সেই জয়ই তাকে সরাসরি সেমিফাইনালে তুলে দেয়। একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়ে যায় অন্তত একটি ব্রোঞ্জ পদক।

অর্থাৎ, এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের জিন্নাত আক্তারকে পদকের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে হয়নি—তবে সেমিফাইনালে উঠে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়েছে এবং সেখানেই তিনি মুখোমুখি হয়েছেন কঠিন এক চীনা প্রতিপক্ষের।

ইতিহাসের পাতায় নেত্রকোনার জিন্নাত

২৩ বছর বয়সী জিন্নাত আক্তারের এই সাফল্য বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্যক্তিগত ইভেন্টে দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ান গেমসে পদকের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ।

দলীয় খেলায় সাফল্য এলেও ব্যক্তিগত ইভেন্টে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল না। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাল উশু। স্বর্ণ কিংবা রুপা না এলেও জিন্নাতের ব্রোঞ্জ তাই বাংলাদেশের জন্য শুধুই একটি পদক নয়। এটি ব্যক্তিগত ইভেন্টে দেশের দীর্ঘ পদক-খরা কাটানোর প্রতীক হয়ে থাকবে।

সামনে আরও বড় স্বপ্ন

সেমিফাইনালে পরাজয় জিন্নাতের এশিয়ান গেমস অভিযান শেষ করেছে, কিন্তু তার অর্জনের গুরুত্ব কমায়নি। বরং দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে ফেলেছেন তিনি। আগামীকাল ফাইনাল শেষে আনুষ্ঠানিক পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে জিন্নাতের গলায় উঠবে সেই কাঙ্ক্ষিত ব্রোঞ্জ। চার দশকের অপেক্ষার পর বাংলাদেশের ব্যক্তিগত ইভেন্টে এশিয়ান গেমসের পদক ফিরে আসবে তার হাত ধরেই।

চীনের উ দি’র কাছে সেমিফাইনালে হেরে স্বর্ণের লড়াই থেকে ছিটকে গেলেও জিন্নাত এখন আর শূন্য হাতে ফিরছেন না। বরং তার হাতে উঠেছে এমন এক অর্জন, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে দীর্ঘদিন মনে রাখা হবে।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles