আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বললেন মার্ক উড

দীর্ঘদিনের চোটের সঙ্গে লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিলেন ইংল্যান্ডের তারকা পেসার মার্ক উড। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী এই বোলার। চোটের কারণে ক্যারিয়ারের বড় একটি সময় মাঠের বাইরে কাটানো উড জানিয়েছেন, এবার আর সেই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেননি তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজের গতি ও আগ্রাসী বোলিং দিয়ে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন উড। তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১৪৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাঁর শিকার ২৫৩ উইকেট। এর মধ্যে ৩৮ টেস্টে নিয়েছেন ১১৯ উইকেট, গড় ৩০.৭৯।

২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় উডের। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে খেলেছেন তিনি। তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই ডানহাতি পেসারের।

২০২২ সালে ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলেরও সদস্য ছিলেন উড। তবে চোটের কারণে সেই আসরের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে মাঠে নামতে পারেননি তিনি।

চোটের সঙ্গে উডের লড়াই নতুন নয়। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ইনজুরির কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের চোটের ধাক্কাই শেষ পর্যন্ত তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিল।

২০২৫-২৬ অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন উড। সেটি ছিল ১৫ মাস পর তাঁর প্রথম টেস্ট ম্যাচ। কিন্তু প্রত্যাবর্তনটা সুখকর হয়নি। ম্যাচে মাত্র ১১ ওভার বোলিং করার পরই তাঁর হাঁটুতে চোটের সমস্যা দেখা দেয়।

এরপর হাঁটুতে ফোলাভাব দেখা দেওয়ায় দ্বিতীয় টেস্ট থেকে ছিটকে যান তিনি। পরে পুরো অ্যাশেজ সিরিজ থেকেই তাঁকে বাদ পড়তে হয়।

শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শে টেস্ট ও ৫০ ওভারের ক্রিকেটে আর খেলা সম্ভব নয়, এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উড।

‘এবার আমি যুদ্ধে হেরে গেছি’

অবসরের ঘোষণা দিতে গিয়ে নিজের দীর্ঘ চোটযুদ্ধের কথা তুলে ধরেছেন উড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত এক বছরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।

উড বলেন, “গত এক বছরের পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি হয়তো খুব বেশি বিস্ময়ের বিষয় নয়। তবে আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়টিতে এসে মনে হচ্ছে, এটাই সরে দাঁড়ানোর স্বাভাবিক সময়।”

চোট থেকে বারবার ফিরে এসে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।

“আমি সবসময় দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেছি। চোট থেকে ফিরে এসে মানুষকে ভুল প্রমাণ করতে এবং আমি কী করতে পারি, তা সবাইকে দেখাতে চেয়েছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবার আমি সেই যুদ্ধে হেরে গেছি,” বলেন উড।

চিকিৎসকদের পরামর্শের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী টেস্ট ও ৫০ ওভারের ক্রিকেট আর সম্ভব নয়। গত এক বছরে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার স্বপ্নটা ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।”

‘ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা ছিল সবচেয়ে বড় সম্মান’

ইংল্যান্ডের হয়ে খেলাকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন উড। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগকে তিনি স্বপ্নপূরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

উড বলেন, “ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয় ছিল, যা আমি কখনো চাইতে পারতাম। এটি ছিল আমার স্বপ্নপূরণ।”

দ্রুতগতির বোলিংয়ের জন্য বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিতি পাওয়া উড ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণে এমন এক বৈশিষ্ট্য যোগ করেছিলেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাঁর বোলিংয়ের গতি এবং প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরির ক্ষমতা ইংল্যান্ডের সাদা বল ও লাল বল, দুই ধরনের ক্রিকেটেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

মার্ক উডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে। সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন উড।

এর তিন বছর পর ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও জেতে ইংল্যান্ড। তবে ইনজুরির কারণে সেই আসরের শেষ দুই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে—সেমিফাইনাল ও ফাইনালে—খেলতে পারেননি তিনি।

তবু ইংল্যান্ডের হয়ে তাঁর সামগ্রিক অবদান এবং বড় ম্যাচে দলের জন্য তৈরি করা পার্থক্য তাঁকে দেশের ক্রিকেটের স্মরণীয় পেসারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

উডের অবসরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রব কি। তাঁর মতে, উডের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কাছ থেকে দেখাটা ছিল বিশেষ অভিজ্ঞতা।

রব কি বলেন, “একটি দুর্দান্ত ক্যারিয়ারের শেষ অংশটি দেখতে পারা ছিল সম্মানের বিষয়।”

উডের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অ্যাশেজ সিরিজের জয়, বিশ্বকাপ এবং প্রতিবার হাতে বল তুলে নিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করার মতো মুহূর্ত তৈরি করা এমন কিছু, যা খুব কম খেলোয়াড়ই অর্জন করতে পারেন।

সংখ্যায় মার্ক উড

ইংল্যান্ডের হয়ে উডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১৪৬ ম্যাচ ও ২৫৩ উইকেট নিয়ে। টেস্টে ৩৮ ম্যাচে তাঁর উইকেট ১১৯টি। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা এই পেসার এক দশকের বেশি সময় ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন।

তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও উডের পরিচয় ছিল তাঁর ভয়ংকর গতি, লড়াকু মানসিকতা এবং চোটের পর বারবার ফিরে আসার চেষ্টায়। শেষ পর্যন্ত শরীরের সঙ্গে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে থামতেই হলো তাঁকে।

ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল ২০২৫-২৬ অ্যাশেজের প্রথম টেস্ট, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আট উইকেটের পরাজয়ের সেই ম্যাচ, যেখানে ১৫ মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেও মাত্র ১১ ওভার পরই থেমে যেতে হয়েছিল তাঁকে।

এবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেও স্থায়ীভাবে থামলেন ইংল্যান্ডের অন্যতম গতিময় পেসার। রেখে গেলেন বিশ্বকাপ জয়, ২৫৩ আন্তর্জাতিক উইকেট এবং চোটকে বারবার পেছনে ফেলে ফিরে আসার এক দীর্ঘ ক্রিকেটগাথা।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles