কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন, সব মিলিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে বিভক্ত পর্তুগাল। তারচেয়েও বড় কথা রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখন নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে। পর্তুগালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা।
তার ভক্ত থেকে শুরু করে সমালোচকরাও আক্ষেপের সুরে বলছেন, ‘রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা কি এমনই হওয়ার কথা ছিল?’
যে খেলোয়াড় বছরের পর বছর পর্তুগালের ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে থেকেছেন, দেশের হয়ে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন এবং একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তার বিদায় যদি শেষ পর্যন্ত হয় সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নয়, বরং ক্ষোভ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে হবে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সমাপ্তিগুলোর একটি।
৪১ বছর বয়সেও রোনালদো জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের পর লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে দু’জনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গতিপথ একেবারেই ভিন্ন হয়ে যায়।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় যেখানে আবেগঘন বিদায়ের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে রোনালদোর ভবিষ্যৎ এখন নির্ধারিত হতে পারে একটি কোচ-খেলোয়াড় দ্বন্দ্বের মাধ্যমে।
পর্তুগালের সাম্প্রতিক ম্যাচে রোনালদোকে নিয়ে তৈরি হয় বড় ধরনের বিতর্ক। নরওয়ের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচে তাকে দীর্ঘ সময় ওয়ার্ম-আপ করতে দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে নামানো হয়নি।

এই ঘটনায় রোনালদো প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। একজন খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত হয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও সুযোগ না পাওয়াকে তিনি সহজভাবে নেননি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দলের প্রতি অবদানের কথা বিবেচনায় নিলে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রোনালদো জানতে পারেন, ডেনমার্কের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচেও তাকে প্রথম একাদশে রাখা হবে না। এরপরই তিনি পর্তুগাল শিবির ছেড়ে চলে যান।
পর্তুগালের নতুন কোচ জর্জ জেসুসও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার মানুষ নন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দলের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেটিই তিনি নেবেন।
অন্যদিকে রোনালদোও এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে বরাবরই স্পষ্ট। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি একাধিকবার দেখিয়েছেন, নিজের পারফরম্যান্স ও দলের ভূমিকা নিয়ে তার প্রত্যাশা কতটা উচ্চ।
ফলে দলের দুই শক্তিশালী ব্যক্তির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে গেছে। তবে জেসুস জানিয়েছেন, রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের দরজা এখনো খোলা। তিনি চাইলে আবারও দলে ফিরতে পারেন।
রোনালদো, তার প্রতিনিধিদের এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। অর্থাৎ, এখনো চূড়ান্ত বিচ্ছেদের ঘোষণা আসেনি।
রোনালদোর পাশে সমর্থকদের বড় অংশ
রোনালদোর প্রতি পর্তুগিজ সমর্থকদের আবেগ যে কতটা গভীর, সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার প্রমাণ মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সমর্থকেরা জেসুসের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। অনেকেই মনে করছেন, দেশের হয়ে ২৩৪ ম্যাচ খেলা এবং ১৪৬ গোল করা একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে আরও সম্মানজনক আচরণ করা উচিত ছিল।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে বেনফিকার স্টেডিয়ামের বাইরেও রোনালদোকে সমর্থন করে এবং জেসুসের সমালোচনা করে একটি ব্যানার দেখা গেছে।
এতে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ বা কোচের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে পর্তুগিজ ফুটবল সমর্থকদের আবেগ ও মতাদর্শের একটি বড় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
তবে রোনালদোর বিরোধীরাও কম সরব নন। পর্তুগালের কিছু সমর্থক এবং দেশটির গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, একজন খেলোয়াড় যত বড়ই হোন না কেন, জাতীয় দলের স্বার্থের ওপরে ব্যক্তিগত ক্ষোভকে স্থান দেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে দল যখন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকে দায়িত্বজ্ঞানহীন হিসেবে দেখছেন।
সমালোচকদের যুক্তি, রোনালদো পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হলেও জাতীয় দলের কাঠামোর মধ্যে তাকেও কোচের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।
সমালোচনা কিংবা বিতর্ক যাই থাকুক, পর্তুগালের জার্সিতে রোনালদোর অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় দলের হয়ে তার ২৩৪ ম্যাচ এবং ১৪৬ গোল, দু’টিই বিশ্বরেকর্ড। বছরের পর বছর ধরে তিনি পর্তুগালের আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র ছিলেন।
তার নেতৃত্বে পর্তুগাল ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ইউরো জয়ের মাধ্যমে।
রোনালদোর ব্যক্তিগত রেকর্ডের তালিকাও দীর্ঘ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তার অবস্থান তাকে ইতিহাসের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তাই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা কীভাবে হবে, সেটি শুধু রোনালদোর ব্যক্তিগত বিষয় নয়; পর্তুগিজ ফুটবলের জন্যও এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
মেসির সঙ্গে তুলনাও সামনে আসছে
রোনালদোর বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। বিশ্বকাপের পর মেসি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার বিদায় ধীরে ধীরে একটি উৎসবমুখর আবেগঘন অধ্যায়ে পরিণত হচ্ছে।
অন্যদিকে রোনালদো ৪১ বছর বয়সেও পর্তুগালের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়তো রোনালদোর চেয়েও কয়েক দিন বেশি স্থায়ী হতে পারে। মঙ্গলবার বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একটি ঘরের মাঠের প্রীতি ম্যাচ মেসির সম্ভাব্য শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, যে দুই খেলোয়াড় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক ছিলেন, তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটাও এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই, রোনালদো কি আবার পর্তুগালের হয়ে মাঠে ফিরবেন? জর্জ জেসুসের বক্তব্য অনুযায়ী, দরজা এখনো খোলা। ফলে রোনালদোর জন্য প্রত্যাবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতি মেনে নেওয়া এবং কোচের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। একই সঙ্গে জেসুসকেও দলের সবচেয়ে বড় তারকার সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়, সেই কঠিন কাজটি করতে হবে।
নভেম্বরে ডেনমার্কের বিপক্ষে পর্তুগালের পরবর্তী ম্যাচের আগে তাই রোনালদোকে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি কি সব বিরোধ ভুলে আবার জাতীয় দলের জার্সি পরবেন?
নাকি নরওয়ের বিপক্ষে সেই হতাশার রাত এবং ডেনমার্ক ম্যাচের আগে দল ছাড়ার ঘটনাই হয়ে থাকবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়?
রোনালদোর মতো একজন খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়া স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা, তার বিদায় যেন কোনো বিতর্ক বা সংঘাতের ছায়ায় ঢাকা না পড়ে।
তার সমর্থকেরা চান, তিনি যেন মাঠে দাঁড়িয়েই শেষবারের মতো পর্তুগালের জার্সি পরে বিদায় নেন। অন্যদিকে, সমালোচকেরা মনে করছেন, দলের শৃঙ্খলা ও কোচের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেই তাকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
সময়ের সঙ্গে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি অবশ্যম্ভাবী—কিন্তু কখন এবং কীভাবে সেই সমাপ্তি হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


