রেফারির শেষ বাঁশিটা যখন বাজল, হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামের একপাশে তখন উৎসবের নীল-হলুদ সুনামি। আর ঠিক তার বিপরীত পাশে? যেন এক থমকে যাওয়া স্তব্ধতা। যে সবুজ গালিচায় একটু আগেও জাপানি যোদ্ধারা রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়াই করছিলেন, সেই ঘাসের ওপরই একে একে লুটিয়ে পড়লেন কাইশু সানো, জায়ন সুজুকিরা। দুই হাতে মুখ ঢেকে, স্বপ্নভঙ্গের তীব্র বেদনায় মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন ব্লু সামুরাইরা ।
ফুটবল কখনো কখনো বড্ড নিষ্ঠুর, বড্ড নির্মম। ২৮ মিনিটে কাইশু সানোর সেই জাদুকরী গোলে লিড নিয়ে ইতিহাস গড়ার যে স্বপ্ন জাপান দেখছিল, তা ৯৫ মিনিটের মাথায় এসে এক বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হলো।
বীরত্বপূর্ণ লড়াই এবং ৫৬ মিনিটের সেই ধাক্কা
প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে গিয়েছিল ব্লু সামুরাইরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্রাজিলের চেনা সাম্বা ঝড় আছড়ে পড়ে জাপানের রক্ষণভাগে। ম্যাচের ৫৬তম মিনিটে ক্যাসেমিরোর সমতাসূচক গোলটি প্রথম ধাক্কা দেয় জাপানি শিবিরে। ১-১ গোলে সমতা ফেরার পর ম্যাচটি যেকোনো দিকেই মোড় নিতে পারত।
গোল হজম করার পরও ভেঙে পড়েনি জাপান। দীর্ঘ সময় ধরে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে যেভাবে জাপানি ডিফেন্স বোতলবন্দী করে রেখেছিল, তা ছিল এক অবিশ্বাস্য বীরত্বগাথা। গোলরক্ষক সুজুকি যখন শরীর ছুঁড়ে দিয়ে ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ নস্যাৎ করছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে এবং জাপান তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।
মাঠের এক করুণ দৃশ্য
কিন্তু নাটকীয়তার তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ ৯৫তম মিনিটে মার্তিনেল্লির সেই জয়সূচক গোলটি জাপানিদের হৃদয়ে যেন তিরের মতো এসে বিঁধল। গোল হজম করার পর জাপানের ফুটবলাররা মাঠে বসেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। সীর্তিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের এই কান্নার কাছে যেকোনো সান্ত্বনাই আজ বড্ড মলিন।
গ্যালারিতে নীল সমুদ্রের নীরবতা
শুধু মাঠের খেলোয়াড়েরাই নন, গ্যালারিতে আসা হাজার হাজার জাপানি সমর্থকও নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ৫৬ মিনিটে সমতা ফেরার পরও যারা বুক বেঁধেছিলেন, ৯৫ মিনিটের ওই এক গোল তাদের সব আশা কেড়ে নেয়। জাপানি ফুটবলাররা যখন ম্যাচ শেষে গ্যালারির দিকে এগিয়ে যান সমর্থকদের ধন্যবাদ জানাতে, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে এই লড়াকু দলকে সম্মান জানায়। কাঁদতে কাঁদতেই সমর্থকেরা প্রিয় দলকে কুর্নিশ করেন।
নকআউটের এই মঞ্চ থেকে হয়তো জাপান বিদায় নিল, কিন্তু তারা বিদায় নিল বীরের মতো। ফুটবল ইতিহাস ট্রফি জয়ীদের মনে রাখে সত্যি, তবে হিউস্টনের মাঠে জাপানের এই অশ্রুসিক্ত লড়াই এবং ফুটবলারদের এই কান্না কোটি ফুটবল প্রেমীর হৃদয়ে আজীবন জমা থাকবে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি হয়ে।
স্কোর কার্ড
বিশ্বকাপ ২০২৩



















