ফুটবলের রাজপুত্র, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, জোগো বোনিতো বা সাম্বা ফুটবলের দেশ, ব্রাজিলকে চেনার জন্য এই বিশেষণগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু বিগত ২৪ বছর ধরে এই ফুটবল পরাশক্তির নামের পাশে যুক্ত হয়েছে এক নির্মম ও অমীমাংসিত সমীকরণ, যার নাম ‘ইউরোপীয় জুজু’। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় দলকে পেলেই যেন খেই হারিয়ে ফেলছে সেলেসাওরা। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের আকস্মিক বিদায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি লাতিন আমেরিকার এই দলটির দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক অন্তহীন পরাজয়ের বৃত্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।
২০০২ সালের পর থমকে যাওয়া ইতিহাস
২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারিয়ে সর্বশেষ পঞ্চমবারের মতো শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল ব্রাজিল। এরপর থেকে গত ছয়টি বিশ্বকাপে ইউরোপের বাধা পেরোতে পারলেই যেন ব্রাজিলের বিশ্বজয় নিশ্চিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবারই নকআউট পর্বে কোনো না কোনো ইউরোপীয় শক্তির সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে তাদের হেক্সা স্বপ্ন।
নকআউট পর্বে ইউরোপের কাছে ব্রাজিলের ব্যর্থতার খতিয়ান:
২০০৬ (কোয়ার্টার ফাইনাল): জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হার।
২০১০ (কোয়ার্টার ফাইনাল): স্নাইডার-রোবেনদের নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে বিদায়।
২০১৪ (সেমিফাইনাল): ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক বিপর্যয়।
২০১৮ (কোয়ার্টার ফাইনাল): বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের কাছে ২-১ গোলে পরাজয়।
২০২২ (কোয়ার্টার ফাইনাল): পেনাল্টি শুটআউটে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায়।
২০২৬ (শেষ ১৬): আর্লিং হাল্যান্ডের নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে স্তব্ধ ব্রাজিল।
আনচেলত্তি এনেও কাটেনি অভিশাপ
ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে এই মানসিক ও কৌশলগত বাধা কাটাতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন (CBF) প্রথা ভেঙে দলে এনেছিল ইউরোপেরই অন্যতম সেরা ট্যাকটিশিয়ান ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, ইউরোপীয় দলগুলোর আধুনিক ও শারীরিক ফুটবল কৌশলের জবাব দেওয়া। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে নরওয়ের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স এবং আর্লিং হাল্যান্ডের ক্ষিপ্রতার সামনে আনচেলত্তির ‘মাস্টারক্লাস’ও মুখ থুবড়ে পড়ল।
কেন এই ব্যর্থতার বৃত্ত?
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি প্রধান কারণ:
১. কৌশলগত অতি-নির্ভরশীলতা ও অনমনীয়তা: লাতিন আমেরিকার দলগুলো সাধারণত একক দক্ষতা ও নান্দনিক ফুটবলের ওপর জোর দেয়। বিপরীতে, ইউরোপীয় দলগুলো অনেক বেশি কৌশলগত, সুশৃঙ্খল এবং দলগত ব্লক তৈরিতে পারদর্শী। নরওয়ের বিপক্ষে প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিসের পর ব্রাজিল যেভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা তাদের মানসিক ভঙ্গুরতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
২. শারীরিক ও গতিশীল ফুটবল: বর্তমান ইউরোপীয় ফুটবল অত্যন্ত গতিময় ও শারীরিক শক্তি-নির্ভর। নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্তোফার আয়ের কিংবা স্ট্রাইকার আর্লিং হাল্যান্ডের মতো দীর্ঘদেহী ও শক্তিশালী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ম্যাচে শারীরিক লড়াইয়ে বারবার পরাস্ত হয়েছে ব্রাজিলের রক্ষণ ও আক্রমণভাগ।
৩. মনস্তাত্ত্বিক চাপ: বছরের পর বছর ধরে ইউরোপীয় দলের কাছে নকআউটে হেরে যাওয়ার ফলে ব্রাজিলের ফুটবলারদের মনে এক ধরণের অবচেতন ভীতি বা ‘সাইকোলজিক্যাল ব্লক’ তৈরি হয়েছে। যার ফলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে (যেমন নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ১০ মিনিটে) স্নায়ু ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা।
নেইমার যুগের বিষাদময় সমাপ্তি
ইউরোপের কাছে ব্রাজিলের এই পরাজয়ের বৃত্তের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক হিরো হয়ে রইলেন নেইমার জুনিয়র। ২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং সবশেষ ২০২৬ টানা চারটি বিশ্বকাপে তিনি বুক চিতিয়ে লড়েছেন। পেলেকে টপকে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই ইউরোপীয় প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে তাঁর চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছে। অবশেষে নরওয়ের কাছে হেরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর অবসরের ঘোষণা এই দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল।
ইউরোপের দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের এই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙা না পর্যন্ত ‘হেক্সা’ ট্রফি ব্রাজিলের জন্য কেবলই এক অধরা স্বপ্ন হয়ে থাকবে। আনচেলত্তির বিদায় কিংবা নেইমারের প্রস্থান; ব্রাজিল ফুটবলের এই ক্রান্তিলগ্নে এখন প্রয়োজন এক আমূল পরিবর্তনের, যা তাদের আবার বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।



