এই প্রশ্নটি এখন বিশ্বের কোটি কোটি সেলেসাও ভক্তের মনে। নেইমারের বিদায় এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হেরে নকআউটে আরও একবার ইউরোপীয় গেরোয় আটকে যাওয়ার পর ব্রাজিল ফুটবল এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় ক্রান্তিকাল পার করছে।
তবে ফুটবলের ইতিহাস বলে, ব্রাজিলকে কখনোই চিরতরে ফুরিয়ে যাওয়া দল ভাবা ঠিক হবে না। কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন এবং সঠিক পদক্ষেপ নিলে সাম্বার দেশ নিশ্চয়ই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। ব্রাজিল ফুটবলের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ও পথগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. নতুন প্রজন্মের ওপর ভরসা (ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগো যুগ)
নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক অবসর একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিল ফুটবলে প্রতিভার অভাব কখনো ছিল না। এখন সময় এসেছে তরুণদের কাঁধে দলের ব্যাটন তুলে দেওয়ার।
- ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রদ্রিগো: রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপের শীর্ষ স্তরে খেলার অভিজ্ঞতা এই দুই তারকার রয়েছে। নেইমারের ছায়া থেকে বের হয়ে এখন তাদেরই দলের মূল নেতা হতে হবে।
- এন্ড্রিক ও তরুণ প্রতিভা: এন্ড্রিকের মতো উদীয়মান ফুটবলারদের এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ করতে হবে, যারা ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের পরিপক্ক করে তুলতে পারবে।
২. ঘরোয়া ফুটবলের আধুনিকায়ন ও পরিকাঠামো বদল
ব্রাজিলের ফুটবলারদের ব্যক্তিগত প্রতিভা বিশ্বমানের, কিন্তু ইউরোপের দলগুলোর তুলনায় তাদের ঘরোয়া ফুটবল অবকাঠামো ও একাডেমি ব্যবস্থা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
- আধুনিক ফুটবল এখন অনেক বেশি ডেটা, স্পোর্টস সায়েন্স এবং ট্যাকটিকাল শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল। ব্রাজিলের তৃণমূল পর্যায় থেকে এই আধুনিক ফুটবল সংস্কৃতির সূচনা করতে হবে।

৩. কার্লো আনচেলত্তির কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
নরওয়ের কাছে হারলেও কার্লো আনচেলত্তির মতো একজন বিশ্বসেরা ইউরোপীয় কোচ ড্রেসিংরুমে থাকা ব্রাজিলের জন্য বড় শক্তি।
- ইউরোপের দলগুলোকে হারাতে হলে তাদের মতোই আধুনিক, সুশৃঙ্খল এবং শারীরিক শক্তির ফুটবল বুঝতে হবে। আনচেলত্তি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোগো বোনিতো’ (নান্দনিক ফুটবল) অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে ইউরোপীয় দলগুলোর ব্লকিং ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল ভাঙা যায়, সেই দীর্ঘমেয়াদী কৌশল তৈরি করতে পারবেন।
৪. মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা
২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে কোনো ইউরোপীয় দল সামনে আসলেই ব্রাজিল মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। এই ‘ইউরোপীয় জুজু’ কাটাতে ফুটবলারদের কৌশলগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক শক্তি ও স্নায়ু ধরে রাখার জন্য শীর্ষস্তরের মেন্টাল ট্রেইনার বা স্পোর্টস সাইকোলজিস্টদের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
অতীতের শিক্ষা: ব্রাজিল সবসময় ফিরে আসে
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ব্রাজিল এর আগেও এমন কঠিন সময় পার করেছে। ১৯৭০ সালের পর ২৪ বছর তারা বিশ্বকাপ জেতেনি। এরপর ১৯৯৪ সালে তারা আবার বিশ্বজয় করে। ২০০২ সালের শিরোপার আগেও ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বড় ধাক্কা খেয়েছিল তারা।
ব্রাজিল ফুটবলের পুনরুত্থান রাতারাতি সম্ভব নয়। নেইমার-পরবর্তী যুগে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে সিবিএফ (CBF) যদি আনচেলত্তির ওপর আস্থা রেখে তরুণদের নিয়ে একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল দল গড়ে তুলতে পারে, তবে হেক্সার অধরা স্বপ্ন পূরণ করে ব্রাজিল ফুটবল অবশ্যই আবার বিশ্বের চূড়ায় ঘুরে দাঁড়াবে। সাম্বার ছন্দ সাময়িকভাবে থমকে গেছে, কিন্তু তা চিরতরে হারিয়ে যায়নি।



