অ্যালিসা হিলির মতো কিংবদন্তি অধিনায়কের জুতোয় পা গলানো সহজ কথা ছিল না। যখন তাঁর কাঁধে অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেট দলের নেতৃত্বের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল, ২৮ বছর বয়সী সোফি মলিনাক্স নিজেই নিশ্চিত ছিলেন না তিনি এই বড় দায়িত্বের চাপ সামলাতে পারবেন কিনা। কিন্তু লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের সামনে আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ট্রফি উঁচিয়ে ধরে মলিনাক্স প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল পাসই করেননি, বরং লেটার মার্কস নিয়ে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
টুর্নামেন্ট জুড়ে বল হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১১টি) উইকেট শিকারী হয়েছেন তিনি। অথচ ইনজুরি আর চারপাশের নানামুখী সংশয় পেরিয়ে তাঁর এই বিশ্বজয়ের গল্পটা ছিল রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর।

ইনজুরির ধাক্কা ও চারপাশের সংশয়
২০২৬ সালের শুরুতে অ্যালিসা হিলি সব ফরম্যাট থেকে অবসরের ঘোষণা দিলে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মলিনাক্সকে। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই পিঠের ইনজুরিতে পড়েন এই অলরাউন্ডার। ফলে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ এবং এক মাস পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের বেশ কিছু ম্যাচ মিস করেন তিনি।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, প্রধান নির্বাচক শন ফ্লেগলার মলিনাক্সের অধিনায়কত্বের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছিল প্রবল সংশয়। কিন্তু সব সন্দেহ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মলিনাক্স মাঠে ফেরেন এবং দলকে বিশ্বসেরার মুকুটে অনুপ্রাণিত করেন।

সংশয় কাটিয়ে ওঠার তৃপ্তি নিয়ে ম্যাচ শেষে মলিনাক্স বলেন:
“সব সংশয় দূর করতে পারার অনুভূতি দারুণ। লর্ডসে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সামনে বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে মাঠ ছাড়ার দিনটি অবিশ্বাস্য রকমের বিশেষ। সত্য বলতে, শুরুতে অধিনায়কত্ব পেয়েই ইনজুরিতে পড়ায় সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। নিজের মনেও সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল যে, আদৌ এটি কাজ করবে কিনা। কিন্তু এই পথচলায় একটা জিনিস শিখেছি “সবসময় বিশ্বাস রাখতে হয়। আমি ভাগ্যবান যে দলের মানুষ আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল, আর আমি এই দলটার ওপর সবকিছুর চেয়ে বেশি বিশ্বাস করি।”

ফাইনালে মলিনাক্সের অবদান এবং মুনির প্রশংসা
লর্ডসের ফাইনালে টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছিলেন মলিনাক্স। ৪ ওভারে ৩২ রান দিয়ে ১ উইকেট নিলেও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বে স্বাগতিকদের ১৫০ রানে আটকে রাখে অস্ট্রেলিয়া। পরে বেথ মুনির ৬4 এবং ফোবি লিচফিল্ডের ৪৮ রানের ওপর ভর করে ৭ উইকেটের সহজ জয় পায় অজিরা।
ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট সেরা হওয়া সতীর্থ বেথ মুনির ভূয়সী প্রশংসা করে অধিনায়ক বলেন: “মুনি (বেথ মুনি) অসাধারণ এক ক্রিকেটার। ও যেন ফাইনাল ম্যাচগুলোর জন্যই তৈরি হয়েছে। ও কতটা ধারাবাহিক, তা গত কয়েক মাসে ওর ব্যাটিং দেখলেই বোঝা যায়। ও একই সাথে স্বাধীনভাবে খেলে, আবার আমার দেখা সবচেয়ে বুদ্ধিমান ক্রিকেটারও বটে। দলের মেয়েরা ওর কথা মন দিয়ে শোনে। ও আমাদের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড, আর আজ উইকেটের পেছনে ওর কিপিং ছিল অন্য মাত্রার।”
ইনজুরি, সমালোচনা আর নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে জয় করে সোফি মলিনাক্স যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে ফিরিয়ে আনলেন, তা নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।



