আজ ফুটবলের ঐতিহাসিক ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ । বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে ২১ সেপ্টেম্বর একটি কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৮২ সালের এই দিনে আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় এমন এক ঘটনা, যার নজির ফুটবলবিশ্বে খুবই বিরল। মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, খেলোয়াড়দের ক্ষোভ, গ্যালারিতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, স্টেডিয়ামের বাইরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, সবশেষে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় দেশের চার তারকা ফুটবলারকে। তাঁরা হলেন কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, প্রয়াত গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ার। চারজনই তখন আবাহনীর গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
ঘটনার সূত্রপাত ঢাকা ফুটবল লিগের শেষ ম্যাচে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডান মুখোমুখি হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। এর আগেই লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছিল মোহামেডান। ফলে শিরোপার হিসাব না থাকলেও শেষ ম্যাচটি আবাহনীর জন্য ছিল মর্যাদার লড়াই। হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে কোহিনুরের গোলে এগিয়ে যায় মোহামেডান।
ম্যাচের শেষদিকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। খেলা শেষ হওয়ার প্রায় ১০ মিনিট আগে আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের জোরালো শট গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন মোহামেডানের গোলরক্ষক মো. মোহসীন। আবাহনীর খেলোয়াড়দের দাবি ছিল, বল গোললাইন অতিক্রম করেছিল। ম্যাচের রেফারি মুনির হোসেন বিষয়টি নিয়ে সহকারী রেফারি মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেওয়া হলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আবাহনীর খেলোয়াড়রা রেফারিদের ওপর চড়াও হন। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতেও। শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্টেডিয়ামের বাইরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গুলিস্তান এলাকায় ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ প- হয়ে যায়।
তবে সেদিনের ঘটনার সবচেয়ে বড় অধ্যায় তখনো বাকি ছিল।

ম্যাচের পরই শুরু হয় গ্রেপ্তার অভিযান
ম্যাচ শেষে আবাহনীর খেলোয়াড়েরা যে যার অবস্থানে ফিরে যান। কেউ ছিলেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে, কেউ ক্লাবে, কেউবা নিজ বাসায়। কিন্তু রাতেই শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। জাতীয় দলের ক্যাম্প, আবাহনী ক্লাব ও খেলোয়াড়দের বাসা থেকে কয়েকজনকে আটক করে নেওয়া হয় রমনা থানায়। শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড় পাকির আলী ও প্রেমলালের মতো বিদেশি ফুটবলাররাও আটক হয়েছিলেন। পরে শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা তাঁদের ছাড়িয়ে নেন।
চার আবাহনী তারকা- সালাউদ্দিন, চুন্নু, হেলাল ও আনোয়ার, তবে রেহাই পাননি। পরদিন সকালে তাঁদের হাজির করা হয় শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে স্থাপিত আঞ্চলিক সামরিক আদালতে। আদালতের রায়ে চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। বিভিন্ন সূত্রে সাজার মেয়াদ নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও চারজনেরই কারাবাস নিশ্চিত ছিল। পরে জনমানুষের ব্যাপক চাপের মুখে ১৭ দিন কারাভোগের পর ৮ অক্টোবর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
সাজার পর চার ফুটবলারকে ঢাকার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাজী সালাউদ্দিন ও আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুকে পাঠানো হয় যশোর কারাগারে। গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ারকে নেওয়া হয় রাজশাহী কারাগারে। তাঁদের ট্রেনে করে নেওয়ার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। হাতকড়া পরা চার ফুটবলারের সেই ছবি পরবর্তীতে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দৃশ্যে পরিণত হয়।
ঈশ্বরদী স্টেশনে চার ফুটবলারের কান্না”
কারাগারে যাওয়ার সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট চুন্নুর কাছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই স্মৃতি কখনই ভোলার নয়। আমৃত্যু এটা মনে থাকবে। ফুটবল খেলে কারাভোগ করার এমন নজির আমি বিশ্বে খুব একটা দেখিনি। কিন্তু আমাদের বেলায় সেটা হয়েছিল।’ ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে চারজনকে আলাদা করে দুই কারাগারে পাঠানোর স্মৃতিও ভুলতে পারেননি চুন্নু। তিনি বলেন, ‘আমরা তখনো জানতাম না, আমাদের দু’ভাগে ভাগ করে দুই কারাগারে পাঠানো হবে। যখন ঈশ্বরদীর দায়িত্বরত পুলিশরা আমাদের বিচ্ছিন্ন করছিল, তখন একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আমরা কোনোভাবেই চাচ্ছিলাম না বিচ্ছিন্ন হতে। খুব কান্না করছিলাম।
আমাদের এই অবস্থা দেখে পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কান্নার রোল পড়ে। তখনই বুঝেছি মানুষ আমাদের কতটা ভালোবাসে।’ যশোর কারাগারে পৌঁছানোর স্মৃতিও তাঁর কাছে আবেগঘন। চুন্নু জানান, তিনি ও সালাউদ্দিন যখন কাঁদছিলেন, তখন কারাগারের সামনে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কর্নেল শওকত আলী। তিনি দু’হাত বাড়িয়ে তাঁদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। চুন্নুর ভাষায়, ‘তখন মনে হয়েছিল একজন অভিভাবক পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

একটি গোল ঘিরেই বদলে যায় সব
অন্যদিকে রাজশাহী কারাগারে ছিলেন হেলাল ও আনোয়ার। আবাহনীতে দীর্ঘদিন একই কক্ষে থাকা দুই সতীর্থ কারাগারেও হয়ে যান সঙ্গী। আনোয়ারের স্মৃতিতে সেই ম্যাচের ঘটনাও স্পষ্ট। তাঁর গোল বাতিলকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। আনোয়ার বলেন, ‘সেই ম্যাচে মোহামেডান এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে। ৮০ মিনিটে আমার একটি গোল বাতিলকে কেন্দ্র করে আবাহনীর খেলোয়াড়রা চড়াও হয়েছিল রেফারিদের ওপর। সেই উত্তেজনা প্রথমে গ্যালারি, এরপর ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকায়। মেজাজ হারিয়ে আমি প্রথম সহকারী রেফারির ওপর চড়াও হই। এরপর হেলালও তাকে পেটায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তখন চলছিল সামরিক শাসন।
মাঠের সেই গন্ডগোলকে তারা পুঁজি করে আমাদের চারজনকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়। ক্রীড়াঙ্গনে পড়ে কালির ছোপ।’
চার ফুটবলারের কারাবাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিবাদ। মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও চার ফুটবলারের মুক্তির দাবিতে পাশে দাঁড়ান মোহামেডানের খেলোয়াড়রাও। প্রয়াত বাদল রায়, আব্দুল গাফফার, ব্যাডমিন্টন তারকা কামরুন্নাহার ডানাসহ ক্রীড়াঙ্গনের অনেকেই আন্দোলনে যুক্ত হন। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরাও তাঁদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নামেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবও নেমেছিল প্রতিবাদে
মোহামেডানের হয়ে সেই ম্যাচে খেলা আব্দুল গাফফার পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘চার ফুটবলারকে আটক ও সাজা দেওয়ার বিষয়টি আমরা মেনে নিতে পারিনি। চারজন ফুটবলারকে দেশদ্রোহ ও সরকার উৎখাতের মতো অভিযোগে সামরিক আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছিল। এরপর সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন জোরদার করি।’ স্মৃতি হাতরে গাফফার বলেন, ‘আবাহনীর চার ফুটবলারকে কারগারে নিয়ে যাওয়ার পর ফুসে উঠে ক্রীড়াঙ্গণ। প্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের হলেও আমরা প্রতিবাদে মিছিল করি। ঠিক ওই মূহুর্তে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ হজ¦ করতে সৌদী আরবে চলে যান। কিন্তু জেলবন্দি চার ফুটবলারকে মাঠে ফেরানোর কোন উদ্যোগ ছিল না কারো। যদিও তৎকালীন ফুটবল ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক ছিলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার)।’ তিনি বলতে থাকেন, ‘আবাহনীর নিবেদিত প্রাণ ছিলেন শাহ আলম চৌধুরী ও কামালুর রহমান। দু’জনেই জিয়াউর রহমানের বন্ধু ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব হজ¦ থেকে যখন দেশে ফিরে আসেন, তখন বেগম খালেদা জিয়া নিজে এরশাদ সাহেবকে টেলিফোন করেছিলেন চার ফুটবলারকে ছেড়ে দিতে। আজ শাহ আলম বেঁচে আছেন। কিন্তু কামালুর রহমান বেঁচে নেই। খালেদা জিয়া টেলিফোন করায় এরশাদ সাহেব ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন।’ যশোর ও রাজশাহী কারাগার থেকে চার ফুটবলারকে ছাড়িয়ে আনার বিষয়ে গাফফার বলেন, ‘আমি ও আমার বন্ধু খোকা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে রাজশাহীতে গিয়েছিলাম। নিজে গাড়ি চালিয়ে আরিচা দিয়ে সেখানে গিয়ে পৌঁছেছিলাম।
ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরে ফুটবলারদের হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতি
মোহামেডানে বাদল ও আমিসহ রাজশাহীতে জাফর ইমামসহ ননী, কুদ্দুস ও তপনের মতো অনেক ফুটবলার সেখানে উপস্থিত ছিল। জাফর ইমামের ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি জেলগেটে বসেছিলেন। তখন আমি চিঠিটা নিয়ে উনাকে হাতে দিই। তখন জাফর ইমাম কারা কর্তৃপক্ষকে দেন। কিছুক্ষণ পর রাজশাহী জেল থেকে বের হয়ে আসে হেলাল ও আনোয়ার। বেরিয়েই আমার ডান কাধে হেলাল ও বাঁ দিকের কাধে আনোয়ার জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। কারণ আমরা খেলার মাঠে যতই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলাম না কেন, মাঠের বাইরে বন্ধু। একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হিেছল।’ বলতে থাকেন গাফফার, ‘অনেক স্টেশনে তাদেরকে ইশ^রদি থেকে দুটি ট্রেন দুদিকে চলে যাচ্ছিল, তখন কান্নার রোল পড়ে চার ফুটবলারের মধ্যে। মাঠের বাইরে আমরা সব সময় হৃদ্যতা ছিল। এক সঙ্গে আড্ডা দিতাম। সম্পর্ক কখনো নষ্ট হয়নি। আমরা যে সময় খেলেছি, আমরা সেটাকে বলি ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর। ইতিহাসে কখনো হয়নি।’
গাফফারের কাছে সেই ঘটনার আরেকটি বেদনাদায়ক দিক ছিল, আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে পরবর্তীতে এশিয়াডের দলে তাঁকে বিবেচনা না করা। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে মানুষের প্রতিক্রিয়া। তাঁর ভাষায়, সেই কালো দিন দেশের ফুটবল ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে এবং এর মধ্য দিয়েই ফুটবলের প্রতি মানুষের অনুরাগ স্পষ্ট হয়েছিল।
১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনা তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ প- হওয়ার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি, সমর্থকদের আবেগ এবং ক্রীড়াঙ্গনের ঐক্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আশির দশকের শুরুতে আবাহনী-মোহামেডানের দ্বৈরথ ছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর একটি। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ম্যাচ কীভাবে মাঠ পেরিয়ে গ্যালারি, রাজপথ এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারের দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, ২১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা তারই স্মারক।
চার তারকা ফুটবলারের হাতকড়া পরা ছবি, ১৭ দিনের কারাবাস, ঈশ্বরদী স্টেশনে বিচ্ছেদের কান্না, কারাগারের সামনে মানুষের ভালোবাসা এবং মুক্তির পর বাঁধভাঙা উল্লাস, সবকিছু মিলিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে আলাদা একটি অধ্যায় হয়ে আছে।
৪৪ বছর আগের সেই দিনটি তাই আজও ফিরে আসে। প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর এলেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে পড়ে সেই কালো অধ্যায়। মাঠের উত্তেজনা থেকে কারাগারের দরজা , ১৯৮২ সালের সেই ঘটনা আজও বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামে অম্লান হয়ে আছে।




