চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ একের পর এক নাটকীয়তা ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়ে এবার শেষ চারে এসে পৌঁছেছে। বিশ্বমঞ্চের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট থেকে আর মাত্র দুটি জয় দূরে দাঁড়িয়ে আছে চারটি পরাশক্তি দেশ, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের এই মঞ্চে সামান্যতম ভুলেরও কোনো সুযোগ নেই। ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দলের এই হাইভোল্টেজ লড়াই নিয়ে তৈরি করা গাইডলাইনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এমবাপ্পে বনাম ইয়ামাল: ইউরোপের দুই পরাশক্তির দ্বৈরথ
ফ্রান্স বনাম স্পেন
- ভেন্যু: ডালাস স্টেডিয়াম
- সময়: বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত ( ১টা)
ম্যাচের মূল আকর্ষণ:
ইউরোপের অন্যতম সেরা দুটি স্কোয়াড মুখোমুখি হওয়ায় এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি ক্লাসিক ম্যাচ হওয়ার সব উপাদান নিয়ে অপেক্ষা করছে।
মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্সের সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে আবারও মূল নায়ক ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা আটে নিয়ে গেছেন তিনি, যা তাঁকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির চেয়ে মাত্র এক গোল পেছনে রেখেছে।
তবে ফ্রান্সের আসল শক্তি হলো তাদের পুরো স্কোয়াডের গভীরতা। কোয়ার্টার ফাইনালে উসমান দেম্বেলে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের গোলসংখ্যা পাঁচে নিয়ে গেছেন। এছাড়া কোচ দিদিয়ের দেশমের দলের হয়ে মাঝমাঠে দারুণ সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন মাইকেল অলিস, যিনি ৫টি অ্যাসিস্ট নিয়ে টুর্নামেন্টের শীর্ষে আছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ইউরো কাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতা স্পেনের বিরুদ্ধে এই দলীয় শক্তি ফ্রান্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে।
স্পেনের সেরা ফুটবল এখনো দেখা বাকি বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ল্যামিন ইয়ামাল এখনো বিশ্বকাপে সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি। বার্সেলোনার এই উইঙ্গার গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাত্র একটি গোল করেছেন। এছাড়া চার গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল গত দুই ম্যাচে কোনো গোল পাননি। ফলে নকআউট পর্বে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় পেতে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের গোলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ১৯ বছরে পা দিতে যাওয়া ইয়ামাল সেমিফাইনালের এই বড় মঞ্চেই নিজের প্রতিভার সবটুকু ঢেলে দেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা ২০১০-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
- ব্রাজিলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফ্রান্স এবার তাদের ৮ম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলবে। তাদের চেয়ে বেশি সেমিফাইনাল খেলেছে কেবল জার্মানি (১২ বার)।
- স্পেন তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারার পর থেকে তারা গত ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত (২৭ জয় ও ৯ ড্র)।
- বিশ্বকাপে এটি এই দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় দেখা। এর আগে ২০০৬ সালের আসরে শেষ ১৬-এর লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েও ফ্রান্স ৩-১ গোলে জিতেছিল।
২. পুরোনো শত্রুতার নতুন অধ্যায়: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ঐতিহাসিক লড়াই
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা
- ভেন্যু: আটলান্টা স্টেডিয়াম
- সময়: বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ১টা।
ম্যাচের মূল আকর্ষণ:
২০১৮ সালের পর এটি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। তবে থ্রি লাইন্সদের ৬০ বছর পর ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
এটি আবেগ এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঠাসা এক ম্যাচ, ঠিক ৪০ বছর আগে মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা একাই ইংল্যান্ডকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় করেছিলেন। এবার আর্জেন্টিনার ডাগআউটে আছেন আরেক সুপারস্টার ‘নম্বর ১০’ লিওনেল মেসি। মেসি এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি, আর প্রথমবার মুখোমুখি হওয়ার জন্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের চেয়ে বড় মঞ্চ আর হতে পারে না। এই টুর্নামেন্টে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বমোট সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া মেসি বর্তমানে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে সমান ৮টি গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন।
তবে ইংল্যান্ডের দলেও আছেন তাদের নিজস্ব আইকনিক ‘নম্বর ১০’ জুড বেলিংহাম। গত দুটি নকআউট ম্যাচের প্রতিটিতেই তিনি দুটি করে গোল করেছেন, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এই কীর্তি গড়লেন। অন্যদিকে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনও সতীর্থ বেলিংহামের সমান ৬টি গোল নিয়ে দারুণ ফর্মে আছেন।
চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলই এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ ছন্দে ফুটবল খেলতে পারেনি; বরং নকআউট পর্বে কঠোর লড়াই ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে এনে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই বুধবারে থমাস টুখেলের শিষ্যদের কাছ থেকে আরও ভালো পারফরম্যান্সের দাবি থাকলেও ম্যাচটি যে একটি স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
- ২০১৮ সাল থেকে ইংল্যান্ড প্রধান টুর্নামেন্টগুলোতে চারবার সেমিফাইনালে উঠেছে, যা ২০১৮ সালের আগের পুরো ইতিহাসে তাদের মোট সেমিফাইনালে ওঠার রেকর্ডের সমান।
- ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচে জয়লাভ করেছে, যা ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এক আসরে তাদের দীর্ঘতম জয়ের রেকর্ড।
- থমাস টুখেল ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অপরাজিত রইলেন। এর আগে ১৯৬৬ সালে অ্যালফ রামসের এই একই রেকর্ড ছিল (৫ জয়, ১ ড্র)।
- আর্জেন্টিনা গত চার আসরের মধ্যে তিনবার (২০১৪, ২০২২, ২০২৬) সেমিফাইনালে পৌঁছাল। ২০১৪ সালের আগে ১৯৯০ সালের পর তারা আর সেমিফাইনাল খেলতে পারেনি।


