ফিফা কাউন্সিলের কাছে ক্ষমা চেয়েও বিতর্ক থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাউন্সিল সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত না করায় তাঁর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইংল্যান্ড ও জার্মানির শীর্ষ ফুটবল কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, বিতর্কিত পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি ফিফার প্রশাসনিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল বাতিল হয়ে যাওয়া ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা এফএফই প্রকল্প। বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে সংখ্যালঘু অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংস্থাটির আয় বাড়ানোর কথা ছিল। তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পর কাউন্সিল সদস্যদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে সমালোচনার মুখে প্রকল্পটি থেকে সরে আসে ফিফা।
বৈঠকে যোগাযোগ ও পরামর্শের ঘাটতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন ইনফান্তিনো। তাঁর বক্তব্য, এফএফই প্রকল্পটি ছিল একটি প্রস্তাব, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। তবে এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ইউরোপের প্রভাবশালী ফুটবল কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, ফিফার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অবহিত করা এবং তাঁদের মতামত নেওয়া জরুরি।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ার (সভাপতি) ডেবি হিউইট এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কাউন্সিল সদস্যদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া এবং এফএফই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা ইনফান্তিনোর দায়িত্ব। পরিকল্পনাটি নিয়ে কোনো তথ্য গোপন করার বিষয় না থাকলে নথি প্রকাশে আপত্তি থাকার কথা নয় বলেও যুক্তি দেন তিনি। হিউইটের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত ফিফার প্রশাসনিক সংস্কার নিয়েও কার্যকর আলোচনা সম্ভব নয়।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বার্ন্ড নয়েনডর্ফও। তাঁর মতে, ফিফার প্রশাসন, পরিচালনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। তবে ইনফান্তিনো দায়িত্বে থাকলে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তাই ফিফার নেতৃত্বে নতুন করে শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন নয়েনডর্ফ। আগামী সভাপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
এদিকে, এফএফই প্রকল্পের বাইরেও ফিফার কয়েকটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা পিস প্রাইজ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখার পর আরোপিত স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি। এসব সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পেছনের কারণ স্পষ্ট না হলে ফিফার পরিচালনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
তবে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থনও রয়েছে। মৌরিতানিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আহমেদ ইয়াহিয়া দাবি করেছেন, ফিফা কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যই ইনফান্তিনোকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। তাঁর মতে, এফএফই প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে দুর্বলতা থাকলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়ন এবং সদস্য দেশগুলোর জন্য বাড়তি অর্থের সংস্থান করা। ইনফান্তিনোর মেয়াদে জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।




