সব প্রতিকূলতার মধ্যেও, নজর কেড়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-স্যামি

ভারত-উইন্ডিজ টি-২০ সিরিজ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ- স্যামি মনে করেন, ভারতের বিপক্ষে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁর দল ভালো করেছে। তাঁর মতে, এমন কিছু অর্জন করেছে ক্যারিবীয়রা, যা তাদেরকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামির কাছে ‘সাফল্য’ মানে শুধু সিরিজ জয় নয়, বরং প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়া। ভারতের বিপক্ষে চলমান টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচের আগে তাঁর এই উপলব্ধি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সিরিজটি এখন ২-২ সমতায় রয়েছে তাই ফাইনাল ম্যাচের অপেক্ষায় রয়েছে দুই দল।

স্যামি বলেন, “আমাদের কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা দর্শকদের কাছে সাফল্যের সংজ্ঞার চেয়ে আলাদা হতে পারে। তবে দল হিসেবে গত ২০ বছরে এই প্রথম আমরা ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে দুইয়ের বেশি ম্যাচ জিতেছি। তাই আমাদের কাছে সাফল্য মানেই অগ্রগতি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা যে সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলোর মধ্যেও যদি বিশ্বের সেরা দল ও বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি, তাহলে আমরা এমন কিছু অর্জন করছি, যা আমাদের আলোচনায় রাখছে। এটাই অগ্রগতি।”

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট বর্তমানে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলোয়াড়দের বেতন কমানো হয়েছে, ঘরোয়া ক্রিকেটারদের চুক্তি কমিয়ে রিটেইনারভিত্তিক করা হয়েছে এবং বেশ কিছু ঘরোয়া টুর্নামেন্ট বাতিল করা হয়েছে। ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের (সিডব্লিউআই) ভাষায়, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর জন্য এসব পদক্ষেপ ‘প্রয়োজনীয়’।

এমন পরিস্থিতিতেও ভারতের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পারফরম্যান্স প্রশংসা কুড়িয়েছে। গুয়াহাটিতে ৪০৫ রান করেও ওয়ানডে ম্যাচটি হেরেছিল তারা। তবে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে ৩৫২ রানের লক্ষ্য তাড়া করে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় ক্যারিবীয়রা।

পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও দারুণ লড়াই করছে দলটি। প্রথম ম্যাচে হারের পর ২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিতেছে তারা। চতুর্থ ম্যাচে ২৪৭ রান করার পর সেই পুঁজি সফলভাবে রক্ষা করেছে। ফলে বেঙ্গালুরুতে সিরিজের শেষ ম্যাচে দুই দলই নামবে ২-২ সমতা নিয়ে।

স্যামির মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেভাবে লড়াই করছে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। “সিরিজ শুরুর আগে আমরা সবাই জানতাম, বেতন কমানোসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো করছে। ভালো খেললে তারা বিশ্ব ক্রিকেটকে বিনোদন দিয়ে যায়। তবে এই সাফল্য প্রতিকূলতার কারণে নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও এসেছে।” ব্যাটারদের দাপটে রেকর্ডময় সিরিজ: এই টি-টোয়েন্টি সিরিজে দুই দলের ব্যাটাররাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। চার ম্যাচ শেষে উভয় দলেরই গড় রান তোলার হার ১১-এর বেশি। ফলে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও বড় সংগ্রহের প্রত্যাশা রয়েছে।

শনিবার বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে বৃষ্টির কারণে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে খেলা হলে ব্যাটারদের জন্য আবারও সহায়ক উইকেট অপেক্ষা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আগের কয়েক দিন ধরেই বেঙ্গালুরুতে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের আগের দিন অনুশীলন করেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ভারতকেও অনুশীলন বাতিল করতে হয়েছে।

তবে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের উন্নত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কারণে বৃষ্টি থামার ৩০ মিনিটের মধ্যেই খেলা শুরু করা সম্ভব। কিন্তু ম্যাচ চলাকালে বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের আবার মাঠে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ভারতের মাটিতে এমন ব্যাটিংবান্ধব উইকেট দেখে অবশ্য অবাক হননি স্যামি। আইপিএলে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতার কারণে ভারতীয় ক্রিকেটাররা এ ধরনের উইকেটে অভ্যস্ত বলেই মনে করেন তিনি।

স্যামি বলেন, “আপনি যখন ভারতে আসবেন, আইপিএল দেখলেই বুঝতে পারবেন-এ ধরনের উইকেটেই এখানকার খেলোয়াড়রা খেলতে অভ্যস্ত। আমাদের সৌভাগ্য, আমাদের দলেও এমন কয়েকজন খেলোয়াড় আছে, যাদের এখানে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে।” তবে বোলারদের জন্য পরিস্থিতি সহজ ছিল না। প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে শিশিরের প্রভাবও বোলারদের কাজ কঠিন করে তুলেছিল। কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে শিশিরের প্রভাব না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে বলে মনে করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ। তাঁর ভাষায়, “বোলারদের জন্য কাজটা কঠিন ছিল। তবে আমার মনে হয়, শেষ দুই ম্যাচে শিশির না থাকায় লড়াইটা কিছুটা সমান হয়েছে। ওই দুই ম্যাচে বোলারদেরও খেলার মধ্যে থাকার সুযোগ ছিল। ভালো উইকেটের সঙ্গে শিশিরের প্রভাব না থাকলে দুই দলের দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। এই সিরিজেও আমরা সেটাই দেখেছি।”

২০ দিনে আট ম্যাচ

সিরিজের শেষ ম্যাচটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য গত ২০ দিনে অষ্টম সাদা বলের ম্যাচ। এর মধ্যে দলটিকে ভারতের এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটতে হয়েছে। পুরো সফরে ভ্রমণ করতে হয়েছে ৮টি ভিন্ন শহরে। স্যামির মতে, দীর্ঘ ভ্রমণ ও ঘন ঘন ম্যাচ খেলায় ক্রিকেটারদের শারীরিক ধকল সামলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “ভ্রমণের কারণে শরীরের ওপর অনেক চাপ পড়ে। ৮টি ভিন্ন শহরে যেতে হয়েছে। আমার মনে হয়, এতগুলো শহরে খেলার সুযোগ সম্ভবত শুধু ভারতেই রয়েছে। প্রতিটি শহরেই আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকে।”

ব্যস্ত সফর উপভোগও করছেন ক্যারিবীয়রা

“ভারতে সফর করতে আমরা ভালোবাসি। এখানকার মানুষ ক্রিকেটের জন্য পাগল। প্রতিবারই পূর্ণ গ্যালারির সামনে খেলতে হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দেখার সুযোগ হয়। এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।” স্যামি জানান, দীর্ঘ সফরে খেলোয়াড়দের সুস্থ রাখা এবং তাদের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে দলের কোচিং, চিকিৎসা ও ফিটনেস বিভাগ। “কোচ হিসেবে এবং দল হিসেবে আমাদের চিকিৎসা ও ফিটনেস দলের সঙ্গে মিলে খেলোয়াড়দের সামলাতে হচ্ছে। সফরটা দীর্ঘ, প্রায় প্রতি অন্য দিনই ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তারপরও সফরটা অসাধারণ কেটেছে।” ভারতের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার কারণে ক্যারিবীয় সমর্থকদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন স্যামি। “আমরা যেভাবে ক্রিকেটকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছি, তা দর্শকদের জন্যও ভালো। ক্যারিবীয় অঞ্চলের মানুষ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভালো করতে দেখতে চায়। আমরা ভালো খেললে সবার মন ভালো হয়ে যায়।”

সবশেষে স্যামির প্রত্যাশা, বেঙ্গালুরুতে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচটি দিয়ে একটি স্মরণীয় সফরের সুন্দর সমাপ্তি ঘটবে। “এটি টেলিভিশনে দেখার মতো অসাধারণ ক্রিকেট হয়ে উঠেছে। আশা করি, আগামীকাল আমরা সেই সুযোগ পাব, যাতে একটি চমৎকার সফর এবং দুর্দান্ত সিরিজের পর্দা নামাতে পারি।” সিরিজের শেষ ম্যাচে এখন দেখার বিষয়-প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা ওয়েস্ট ইন্ডিজ কি ভারতের মাটিতে আরেকটি স্মরণীয় জয় তুলে নিতে পারবে?

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles