২০১৮ সালের পর প্রথমবার টেস্ট সিরিজ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। দীর্ঘ সময় পার হলেও দুই দলের সিরিজ ঘিরে ফিরে এসেছে স্যান্ডপেপারগেট কেলেঙ্কারির ছায়া। ২০১৮ সালে ডারবানে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ২২৫। দিনটি নিয়ে তখন বলা হয়েছিল, ‘নিরিবিলি’ এবং ‘সাদামাটা’। কিন্তু সেটি ছিল নিছকই এক মিথ্যা স্বস্তির সূচনা।
এরপর যা ঘটেছিল, তা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় কয়েক সপ্তাহে পরিণত হয়। কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারি ছিল সেই নাটকের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। পুরো সিরিজজুড়েই ছিল একের পর এক বিতর্ক। সিরিজ শুরুর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে এক বছরের জন্য এবং ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে নয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও শাস্তির বড় কারণ ছিল ঘটনাটি গোপন করার চেষ্টা ও ক্রিকেটের ভাবমূর্তির ক্ষতি, শুধু বল টেম্পারিং নয়।
হেড কোচ ড্যারেন লেহম্যানকে নিয়ে দ্রুত তদন্ত করে তাকে ঘটনার পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞাত বলে ছাড় দেওয়া হয়। তবে শেষ টেস্টের আগে, জোহানেসবার্গের দ্য ওয়ান্ডারার্সে, তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। অস্ট্রেলিয়ান দলের পাশাপাশি দুই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়েও দুটি আলাদা তদন্ত শুরু হয়। এর ফল হিসেবে ক্রিকেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশ কয়েকজনকে তাদের অবস্থান হারাতে হয়।
আট বছর পর আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় অস্ট্রেলিয়া
আট বছরেরও বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়া আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট খেলতে এসেছে। ২০২১ সালের শুরুতে তাদের একটি টেস্ট সফর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সেই সিরিজ বাতিল হয়।
তবে ২০১৮ সালের পর অস্ট্রেলিয়া দুবার দক্ষিণ আফ্রিকায় সীমিত ওভারের সিরিজ খেলেছে। ২০২০ সালের সফরে স্মিথ ও ওয়ার্নার নিউল্যান্ডসেই খেলেছিলেন। এমনকি যে জোহানেসবার্গের হোটেলে ২০১৮ সালের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা হয়েছিল, সেই একই হোটেলেও দলটি অবস্থান করেছিল। এরপর ২০২৩ সালেও তারা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করে।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা ও বিশ্বের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি লড়াইয়ে ২০১৮ সালের স্মৃতি স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসবে। সেই সময়ের ক্রিকইনফোর বিস্তৃত প্রতিবেদন অনুসরণ করে ঘটনাগুলো আবার দেখে নেওয়া যাক।
ডারবানের সিঁড়িঘর
প্রথম দিনটা ছিল মোটামুটি শান্ত। কিন্তু সিরিজের প্রকৃত উত্তাপ প্রকাশ পেতে বেশি সময় লাগেনি। সিরিজ শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা বল ‘ডেড’ থাকা অবস্থায় স্টাম্প মাইক্রোফোনের শব্দ কমিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। এমনকি প্রতিপক্ষের স্পনসরদের নাম উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টাও করেছিলেন।
তবে মাঠের পরিস্থিতি নিয়ে এবি ডি ভিলিয়ার্স তখনও বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ বেশ ভালোই ছিল। আগেরবারের তুলনায় তারা বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল।’
সিরিজের চতুর্থ দিনে প্রথম বড় উত্তেজনা দেখা দেয়। ডি ভিলিয়ার্সকে রানআউট করার পর অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা ব্যাপক উল্লাস করেন। ডেভিড ওয়ার্নার ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং সঙ্গী এইডেন মার্করামের দিকে চিৎকার করেন। এরপর নাথান লায়ন মাটিতে পড়ে থাকা ডি ভিলিয়ার্সের কাছাকাছি বল ফেলে দেন। এ ঘটনার জন্য পরে আইসিসি তাকে অভিযুক্ত করে। মাঠের বাইরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দর্শকদের অশালীন মন্তব্যের কারণে নিরাপত্তাকর্মীদের অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপ করতে হয়।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষে, যখন অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য আর মাত্র একটি উইকেট দরকার, তখন কিংসমিডের ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সিঁড়িতে ওয়ার্নার ও কুইন্টন ডি ককের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি সামলাতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস শুধু একটি তোয়ালে জড়িয়ে ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে আসেন।
পরদিন অস্ট্রেলিয়া মাত্র ২০ বলেই ম্যাচ শেষ করে ফেললেও সিঁড়িঘরের ঘটনার রেশ কাটেনি। দুই দলই দাবি করছিল, প্রতিপক্ষই প্রথমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছিল। স্মিথ বলেন, ডি কক ওয়ার্নারকে এমন কিছু বলেছিলেন যা ‘সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল’। পরে জানা যায়, কথাগুলো ওয়ার্নারের স্ত্রী ক্যান্ডিসকে ঘিরে ছিল বলে অভিযোগ। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার দাবি ছিল, ওয়ার্নারই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন।
স্মিথ বলেছিলেন,
আমি বলছি না ভবিষ্যতে আর কখনো কিছু ঘটবে না। তবে আমার মনে হয়, আমাদের খেলাটাকে খেলার চেতনার মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে।’
দুই দিন পর ওয়ার্নার ও ডি কককে আইসিসি অভিযুক্ত করে। ওয়ার্নারের বিরুদ্ধে ছিল লেভেল-২ অভিযোগ, যা তাকে নিষেধাজ্ঞার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ডি ককের বিরুদ্ধে ছিল লেভেল-১ অভিযোগ।
রাবাদার কাঁধে স্মিথ
এরপর সিরিজ চলে যায় পোর্ট এলিজাবেথে, যা এখন গকেবেরহা নামে পরিচিত। মাঠে ও মাঠের বাইরে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনেই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের দুই কর্মকর্তা ক্লাইভ একস্টিন ও আলতাফ কাজির এমন একটি ছবি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে তারা সনি বিল উইলিয়ামসের মুখোশ পরা সমর্থকদের সঙ্গে ছবি তুলছিলেন। এটি ছিল ডেভিড ওয়ার্নারের সঙ্গে তার স্ত্রী হওয়ার আগে ক্যান্ডিস ও সনি বিল উইলিয়ামসের একটি বহুল আলোচিত ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত।
ওয়ার্নারের মতো ফাফ ডু প্লেসিস ও কাগিসো রাবাদাও আগের শাস্তির কারণে আরেকটি অপরাধ করলেই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তেন। সিরিজে সেটিই পরে বড় ভূমিকা নেয়।প্রথম দিনের খেলায় স্মিথকে আউট করে রাবাদা পাঁচ উইকেট নেন। এরপর স্মিথের সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শে আসেন এবং তাকে বিদায়সূচক ইঙ্গিতও করেন। শারীরিক সংস্পর্শের কারণে আইসিসি তাকে লেভেল-২ অভিযোগে অভিযুক্ত করে। অভিযোগ বহাল থাকলে সিরিজ থেকেই ছিটকে যেতেন রাবাদা।
বিষয়টির শুনানি শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়ার্নারকে বিদায়সূচক ইঙ্গিত করে রাবাদা আরও একটি ডিমেরিট পয়েন্ট অর্জন করেন। রাবাদা বলেছিলেন, ‘এটা থামাতে হবে। আমি এভাবে চলতে থাকলে দলকে হতাশ করছি, নিজেকেও হতাশ করছি।’ এরপর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল সিরিজই শেষ তার জন্য।
ডু প্লেসিস সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ওয়ার্নারের সিঁড়িঘরের ঘটনা আরও গুরুতর ছিল। উত্তপ্ত প্রথম টেস্টের পর ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো খেলোয়াড়দের সিরিজ থেকে বাদ দিতে চান না, এমন কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
দুদিন পর রাবাদা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্টের মাঝে ১০ দিনের বিরতি থাকায় শুনানির সুযোগ ছিল। ছয় ঘণ্টার শুনানির পর রাবাদা আপিলে জয়ী হন। তার দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হয়, অভিযোগ লেভেল-১-এ নামিয়ে আনা হয় এবং ডিমেরিট পয়েন্ট কমিয়ে তাকে নিষেধাজ্ঞার সীমার নিচে রাখা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার টিম ম্যানেজার মোহাম্মদ মুসাজি বলেন, ‘সিরিজ এবং টেস্ট ক্রিকেটের জন্য এটি দারুণ।’ তবে স্মিথ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষায়, ‘আইসিসি তো মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে, তাই না? মাঝমাঠে স্পষ্টতই শারীরিক সংস্পর্শ হয়েছিল।’
হলুদ চিহ্ন
নিউল্যান্ডসে তৃতীয় টেস্টের প্রথম দিন শুরুতে মূল আলোচনার বিষয় ছিল ক্রিকেট। ডিন এলগার দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেন। প্যাট কামিন্সের দুর্দান্ত রিভার্স সুইংয়ের স্পেলে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং ধসে পড়ে।
কিন্তু সেই আবহ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের শুরুতে ওয়ার্নার রাবাদার ওপর চড়াও হন। চতুর্থ ওভারের শেষ তিন বলে তিনটি চার মারার পর পরের ওভারের প্রথম বলে ছক্কা এবং এরপর আরেকটি বাউন্ডারি হাঁকান তিনি।
কিন্তু পাঁচ বলে ২২ রান দেওয়ার পর রাবাদা ওয়ার্নারের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দেন। এক ডিমেরিট পয়েন্টের জন্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকা রাবাদা সতীর্থদের সঙ্গে সংযতভাবেই উদযাপন করেন। তবে মাঠ ছাড়ার সময় ওয়ার্নারের সঙ্গে এক দর্শকের তর্ক হয়।
ড্যারেন লেহম্যান বলেন, ‘এই টেস্ট সিরিজে নানা ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এটি সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। এটা খুবই লজ্জাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে গালিগালাজ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনো ক্রিকেট মাঠেই গ্রহণযোগ্য নয়, বিশ্বের কোথাও নয়।’
মাঝে নাথান লায়নের ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘাটতি ৫৬ রানে সীমাবদ্ধ থাকে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো অবস্থান তৈরি করতে থাকে। ৪৩তম ওভারের শেষে স্কোর যখন ২ উইকেটে ১২৯, তখন আম্পায়াররা মাঠের মাঝখানে ক্যামেরন ব্যানক্রফটের সঙ্গে কথা বলেন। ক্রিকইনফোর বল-বাই-বল ধারাভাষ্যে উল্লেখ করা হয়, তারা ব্যানক্রফটের পকেটে কী আছে তা জানতে চেয়েছিলেন। তিনি একটি নরম কাপড় দেখান, যা দেখতে সানগ্লাসের কেসের মতো ছিল।
পাঁচ ওভার পর চা-বিরতি হয়। এর মধ্যে দ্বাদশ খেলোয়াড় পিটার হ্যান্ডসকম্বের মাধ্যমে মাঠে বার্তা পৌঁছে যায়, বড় পর্দায় কিছু ফুটেজ দেখানো হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর ব্যানক্রফট যে জিনিসটি পরে স্যান্ডপেপার হিসেবে চিহ্নিত হয়, সেটি প্যান্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। এরপর পুরো দিনজুড়ে প্রশ্ন ও জল্পনা বাড়তে থাকে। তবে মাঠের দুই আম্পায়ার নাইজেল লং ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ বল পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করেননি এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ রান পেনাল্টিও দেওয়া হয়নি।
স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে
দীর্ঘ বিলম্বের পর ব্যানক্রফট ও স্মিথ সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেন। ততক্ষণে বলের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করার অভিযোগে ব্যানক্রফটকে আইসিসি অভিযুক্ত করেছে। তখনও তারা স্বীকার করেননি যে ব্যবহৃত জিনিসটি স্যান্ডপেপার ছিল। তবে বল টেম্পারিংয়ের কথা স্বীকার করেন।
স্মিথ বলেন,
এই সিরিজে আমরা বল রিভার্স করতে দেখেছি এবং এই বলটি রিভার্স করার মতো মনে হচ্ছিল না। এটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল।
স্মিথ আরও জানান, তিনি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান।
‘আমি এখনো মনে করি, এই কাজের জন্য আমিই সঠিক ব্যক্তি।’ তিনি ‘লিডারশিপ গ্রুপ’-এর কথা উল্লেখ করেন, যারা পরিকল্পনাটি সম্পর্কে জানত বলে দাবি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই শব্দবন্ধটি বড় বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ ওই গ্রুপে মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডের নামও ছিল।
পরবর্তী তদন্তে বলা হয়, বোলাররা এই পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তবে অনেকেই এতে সন্তুষ্ট হননি। ২০২১ সালে ব্যানক্রফট দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বোলাররা কী ঘটছে তা জানতেন , এটি ‘স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়’। এর পর স্টার্ক ও হ্যাজলউড যৌথ বিবৃতি দিয়ে আবারও জানান, তারা এই পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
অস্ট্রেলিয়ায় ভূমিকম্প
২০১৮ সালে বল টেম্পারিংয়ের খবর যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন অস্ট্রেলিয়ায় রাত। দেশটি সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও পৌঁছে যায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা খবর শুনে আমরা সবাই আজ সকালে হতবাক ও গভীরভাবে হতাশ হয়েছি। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, এটা বিশ্বাস করাই কঠিন।’
নিউল্যান্ডসে খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার আগেই স্মিথ ও ওয়ার্নারকে অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। টিম পেইন অধিনায়কের দায়িত্ব নেন। ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ৩২২ রানে হেরে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১০৭ রানে অলআউট হয় তারা। এর আগে ব্যানক্রফট ও ওয়ার্নার ৫৭ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছিল। তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন ইন্টিগ্রিটি বিভাগের প্রধান ইয়ান রয় এবং পারফরম্যান্স বিভাগের প্রধান প্যাট হাওয়ার্ড।তদন্তটি মূলত নিউল্যান্ডসে ওই দিনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ ছিল। সিইও জেমস সাদারল্যান্ড, যিনি খবর প্রকাশের সময় প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাননি, পরে সেখানে উড়ে যান। এর মধ্যেই বাণিজ্যিক অংশীদারদের কেউ কেউ চুক্তি থেকে সরে যেতে শুরু করেন।
তিন দিন পর স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটকে নিষিদ্ধ করা হয়। তিনজনই জোহানেসবার্গ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান এবং আবেগঘন সংবাদ সম্মেলন করেন। প্রথমে স্মিথ ও ওয়ার্নারের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল করার আলোচনা ছিল। তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা শাস্তি মেনে নেন। সম্প্রতি কোড স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মিথ বলেন, ওই সময় তিনি নিজেকে পরিত্যক্ত মনে করেছিলেন।
‘আমার মনে হয়েছিল, বিমানবন্দর পর্যন্ত আমাকে একপ্রকার একা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আমার পাশে কেউ ছিল না।’ শেষ টেস্টে দ্য ওয়ান্ডারার্সে দক্ষিণ আফ্রিকা সহজেই জয় পায় এবং সিরিজ ৩-১ ব্যবধানে জিতে নেয়।
এরপর টিম পেইন পূর্ণকালীন টেস্ট অধিনায়ক হন। ২০২১ সালের শেষ দিকে নিজেকে ঘিরে আরেক বিতর্কের মধ্যে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। জাস্টিন ল্যাঙ্গার প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত থাকেন। বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারির প্রভাব ২০১৮ সালজুড়েই অব্যাহত ছিল। ওই বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত হয় ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন।
স্মিথ ও ওয়ার্নার ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন। অন্যদিকে ব্যানক্রফটও নির্বাচনের কারণে সেই বছর অ্যাশেজ সিরিজের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া দলে ফিরে আসেন। ওই সিরিজে স্মিথ ৭৭৪ রান করেন।
ওয়ার্নারের শাস্তির অংশ হিসেবে তার ওপর আজীবন নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০২৪ সালে সেটি তুলে নেওয়া হয় এবং তিনি সিডনি থান্ডারের অধিনায়ক হতে পারেন।২০১৮ সালের ঘটনা নিয়ে ওয়ার্নারের কাছে আরও কিছু বলার আছে, এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও এখন পর্যন্ত তিনি তা প্রকাশ করেননি।
২০২৬: পুরোনো গল্পের নতুন অধ্যায়
এই সিরিজের সূচি ২০১৮ সালের মতোই। তিনটি টেস্ট একই ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে। অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের বোলিং আক্রমণের প্রমাণও এবার দেখা যেতে পারে। আগামী সপ্তাহে ডারবানে তারা সম্ভবত সেই একই মূল পেস-স্পিন আক্রমণ নিয়ে মাঠে নামবে, যারা আট বছর আগে প্রথম তিন টেস্টে খেলেছিল, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, বর্তমান অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং নাথান লায়ন।
স্টিভ স্মিথও দলে আছেন এবং এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে বিবেচিত। নেতৃত্বের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তিনি অস্ট্রেলিয়াকে ১০টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কামিন্স চোটে পড়লে তিনিই অধিনায়কের দায়িত্ব নেবেন।
ম্যাট রেনশও দলে রয়েছেন। ২০১৮ সালের শেষ টেস্টের জন্য যাদের দ্রুত দক্ষিণ আফ্রিকায় উড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাদের একজন। এবার তিনি ওপেনিংয়ে নামার সম্ভাবনায় আছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার দলে ২০১৮ সালের সিরিজের পাঁচজন পর্যন্ত খেলোয়াড় থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে বর্তমান অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাও রয়েছেন। তবে গত বছর লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ৯ উইকেট নেওয়া কাগিসো রাবাদা চোটের কারণে অনিশ্চিত।
জশ হ্যাজলউড গত মাসে বলেন, ‘ওই সিরিজের মতো কোনো সিরিজ আমি আর দেখিনি। প্রথম বল থেকেই সবকিছু ছিল একেবারে অতিরিক্ত পর্যায়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হয়তো দুই দলই এমন একটা অবস্থায় ছিল, যেখানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। তারা দীর্ঘদিন সফরে ছিল, মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিল। সবকিছুই ছিল মাত্রাতিরিক্ত।’
‘এবার আর এমন কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না।’




