গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন স্প্যানিশ ফুটবলার

মাঠের মাঝখানে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব টেনেরিফের স্ট্রাইকার হেসুস দে মিগেল। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে ৩০ বছর বয়সী এই ফুটবলারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার ক্লাব।

ফুটবল মাঠে আবারও নেমে এলো শোকের ছায়া। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পর না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন টেনেরিফের ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগেল। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৩০ বছর।

গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন স্প্যানিশ ফুটবলার
ম্যাচ চলাকালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন টেনেরিফের স্ট্রাইকার হেসুস দে মিগেল।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দে মিগেলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে স্প্যানিশ ক্লাব সিডি টেনেরিফ। ক্লাবটি জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় (জিএমটি সকাল ৭টা) মারা গেছেন এই স্প্যানিশ ফুটবলার।

বিবৃতিতে টেনেরিফ জানায়, ‘বুকভরা কষ্ট, গলায় কান্না আর অবিশ্বাস নিয়ে সিডি টেনেরিফ জানাচ্ছে, আমাদের খেলোয়াড় হেসুস দে মিগেল আলামেদা আর নেই। এই শোকের কোনো ভাষা নেই। কোনো কিছুই এই গভীর বেদনা কমাতে পারবে না। আমরা তার পরিবার, ঘনিষ্ঠজন এবং টেনেরিফ সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

স্প্যানিশ দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে এফসি আন্দোরার বিপক্ষে খেলছিল টেনেরিফ। ম্যাচের শেষ দিকে হেলিওদোরো রদ্রিগেজ লোপেজ স্টেডিয়ামে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি। তখন দুই দলের স্কোর ছিল ২-২।

মাঠের মাঝামাঝি বল ক্লিয়ার করতে নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে আসেন এফসি আন্দোরার গোলরক্ষক এবং ইকুয়েটোরিয়াল গিনির জাতীয় দলের ফুটবলার হেসুস ওওনো। এ সময় দে মিগেলের সঙ্গে তার সজোরে সংঘর্ষ হয়। গোলরক্ষকের ফাউলের কারণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন টেনেরিফের এই স্ট্রাইকার।

গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন স্প্যানিশ ফুটবলার
ইকুয়েটোরিয়াল গিনির জাতীয় দলের গোলরক্ষক হেসুস ওওনো বল ক্লিয়ার করার জন্য নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে এলে মাঠের মাঝখানে তাঁর ফাউলের শিকার হন হেসুস দে মিগেল।

ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দে মিগেলের হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে তাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয় তাকে।

তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। টেনেরিফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তার স্নায়বিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার সকালে মৃত্যুর কাছে হার মানেন এই ফুটবলার।

এদিকে ভয়াবহ ওই সংঘর্ষের পর গোলরক্ষক হেসুস ওওনোকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। পরবর্তী সময়ে ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

শোকের ছায়া স্প্যানিশ ফুটবলে

দে মিগেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্পেনের ফুটবল অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলো শোক প্রকাশ করেছে।

সাবেক বার্সেলোনা ডিফেন্ডার এবং এফসি আন্দোরার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক জেরার্ড পিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমি গভীরভাবে শোকাহত। শান্তিতে ঘুমাও, হেসুস।’

এফসি আন্দোরাও এক বিবৃতিতে দে মিগেলের পরিবারের সদস্য, সতীর্থ এবং টেনেরিফ ক্লাবের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।

স্প্যানিশ ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও (আরএফইএফ) এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে।

সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই দুঃখজনক সংবাদে আমরা ভেঙে পড়েছি। আজ তার মৃত্যুতে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন গভীর শোক প্রকাশ করছে।’

স্থগিত একাধিক ম্যাচ, শ্রদ্ধা জানাল রিয়াল-বার্সা

দে মিগেলের মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলবারের কোপা দেল রে এবং কোপা দে লা রেইনার ম্যাচগুলো স্থগিত করেছে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। ফুটবলারের প্রতি সম্মান ও সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার অনুশীলন শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করে রিয়াল মাদ্রিদ। শোক প্রকাশ করেছেন ক্লাবটির ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘অসীম দুঃখ। বলার মতো কোনো ভাষা নেই।’

এ ছাড়া স্প্যানিশ লা লিগার ক্লাব এস্পানিওল তাদের নতুন কোচ এদের সারাবিয়ার পরিচিতি অনুষ্ঠান এক দিন পিছিয়ে বুধবার নির্ধারণ করেছে।

লা লিগার প্রধান হাভিয়ের তেবাস এবং স্পেনের ক্রীড়ামন্ত্রী মিলাগ্রোস তোলনও শোক প্রকাশ করেছেন।

তেবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আজ আমরা সবাই এক অপূরণীয় ক্ষতির ভয়াবহ বেদনা ভাগ করে নিচ্ছি।’

অন্যদিকে ক্রীড়ামন্ত্রী তোলন দে মিগেলের পরিবার, স্বজন, টেনেরিফ ক্লাবের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

টেনেরিফের হয়ে খেলছিলেন এক মৌসুমের বেশি সময়

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ক্যাস্তেয়ন থেকে টেনেরিফে যোগ দিয়েছিলেন দে মিগেল। ক্লাবটির হয়ে এক মৌসুমের বেশি সময় কাটিয়েছেন তিনি। দলটির দ্বিতীয় বিভাগে উন্নীত হওয়ার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এই ফরোয়ার্ডের।

ফুটবলে তার পথচলা শুরু হয়েছিল মাদ্রিদের উপকণ্ঠে লেগানেসের যুব দলে। পরবর্তী সময়ে স্পেনের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন তিনি। এর মধ্যে ছিল ইউনিয়নিস্তাস দে সালামাঙ্কাও। ২০২৩ সালে যোগ দিয়েছিলেন ক্যাস্তেয়নে। সেখান থেকে ২০২৫ সালে টেনেরিফে আসেন।

ক্যারিয়ারের মাঝপথে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকাহত তার পরিবার, সতীর্থ, ক্লাব এবং স্পেনের ফুটবলপ্রেমীরা। একটি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা কেড়ে নিল মাত্র ৩০ বছর বয়সী এক ফুটবলারের জীবন। তার মৃত্যুতে স্প্যানিশ ফুটবলে নেমে এসেছে গভীর শোক।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles