ক্রীড়াঙ্গনে কতশত রূপকথার গল্পই তো তৈরি হয়, তবে লিওনেল মেসি এবং লামিনে ইয়ামালের এই গল্পটি যেন সব কল্পনাকেও হার মানায়। গত বুধবার রোমাঞ্চকর ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে পা রাখল, তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় এক অবিশ্বাস্য মহারণ।
রোববারের ফাইনালে ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি লিওনেল মেসির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন স্পেনের ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল, যাকে ইতিমধ্যেই ফুটবল বিশ্বে মেসির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তবে নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির মাঠে রবিবারের এই শিরোপা নির্ধারণী লড়াইটি কিন্তু মেসি ও ইয়ামালের প্রথম দেখা নয়।
প্রায় ১৯ বছর আগে স্পেনের বার্সেলোনায় প্রথমবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। তখন ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি খেলতেন এফসি বার্সেলোনায়। একটি দাতব্য ফটোশুটের অংশ হিসেবে মেসি তখন মাত্র ৫ মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে পরম যত্নে প্লাস্টিকের টবে গোসল করিয়েছিলেন—যার ছবি এখন নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল।
২০২৪ সালের ইউরো কাপে যখন ১৬ বছর বয়সী ইয়ামাল স্পেনের হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছিলেন, তখন তার বাবা মুনির নাসরাউই ইনস্টাগ্রামে সেই ফটোশুটের একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘দুই কিংবদন্তির পথচলার শুরু।’ প্রথম দেখায় বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের অনেকেই একে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর কারসাজি ভেবেছিলেন। কিন্তু বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) দ্রুতই ছবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে।
২০০৭ সালের শরতে বার্সেলোনার ঘরের মাঠ ক্যাম্প ন্যু-এর ড্রেসিংরুমে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট। ইউনিসেফ এবং কাতালান সংবাদপত্র ‘দিয়ারিও স্পোর্ট’-এর একটি যৌথ দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য এই ফটোশুটের আয়োজন করা হয়েছিল। ইয়ামালের পরিবার লটারিতে জিতে বার্সার কোনো খেলোয়াড়ের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিল।
মনফোর্ট জানান, সে সময় মেসি ভীষণ লাজুক ছিলেন এবং প্লাস্টিকের বালতিতে থাকা একটি শিশুকে কীভাবে কোলে নিতে হবে, তা নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর সেই শিশু ইয়ামাল এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা। মেসির স্মৃতিবিজড়িত ক্লাব বার্সেলোনায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে অভিষেক ঘটিয়ে রেকর্ড গড়েছেন, জিতেছেন লা লিগা ও ইউরো ২০২৪-এর ট্রফি। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেও উরুগুয়ে, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে একাই কাঁপিয়ে দিয়েছেন এই তরুণ।
নিজের উত্তরসূরিকে নিয়ে মেসিও প্রশংসা করতে ভোলেননি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে যদি কাউকে বেছে নিতে হয়, তবে তার বয়স ও বর্তমান পারফরম্যান্স বিবেচনা করে আমি লামিনেকেই বেছে নেব। আমার চোখে সেই সেরা।’
আজকের ফাইনালটি কি তবে মেসির থেকে ইয়ামালের হাতে ফুটবলের ব্যাটন হস্তান্তরের মুহূর্ত হতে যাচ্ছে? নাকি শেষ হাসি হাসবেন ফুটবল জাদুকুর নিজেই? উত্তর যা-ই হোক না কেন, মনফোর্টের ভাষায় বলতে হয়, ‘ভাগ্য সত্যিই এক অদ্ভুত খেলা খেলে! সেদিন কেউ কল্পনাও করেনি এই শিশুটি আজ কোথায় পৌঁছাবে, আর মেসিই বা কতটা উঁচুতে উঠবেন।’


