বিশ্বকাপ শিরোপা জিতবে কে, স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা ? এই প্রশ্ন এখন কোটি ফুটব ভক্তের। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় নিউইয়র্কে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের শক্তিশালী দল স্পেন। শিরোপা নির্ধারণী এই লড়াই শুধু দুই দলের নয়, ম্যাচের ভেতরে কয়েকটি ব্যক্তিগত দ্বৈরথও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দলীয় লড়াইটা আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের। এর ভেতরে আরও অনেকে তৈরি হয়ে আছেন ‘সম্মুখযুদ্ধে’ লড়তে, দলকে সাফল্যের চূড়ার পথটি দেখাতে। আক্রমণ, রক্ষণ, মাঝমাঠ- তিন বিভাগে দুই দলের নির্ভরতার কমতি নেই। উত্তাপের ঝাঁঝ, রোমাঞ্চের রেণু তাই ছড়িয়ে পড়ছে নিউ ইয়র্কের ফাইনাল ঘিরে।
বিশ্বকাপের শিরোপা লড়াইয়ে বাংলাদেশ সময় ২০ জুলাই ১টায় (এএম) মুখোমুখি হবে দুই দল। শিরোপা ধরে রাখার শেষ ধাপে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা। আর ২০১০ সালের পর, দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ী হওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা স্পেনের।
দুই দলই সেরা, নির্ভরযোগ্য, ক্ষিপ্র ‘যোদ্ধা’দের নিয়ে মহারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিন বিভাগে তিনটি ‘ডুয়েলস’- হয়ে উঠতে পারে ফাইনালের নির্ণায়ক।
লিওনেল মেসি বনাম এমেরিক লাপোর্ত দ্বৈরথ

দুই সপ্তাহের একটু আগে ৩৯ বছরে পা রেখেছেন মেসি। কিন্তু বয়স এই মহাতারকার কাছে স্রেফ সংখ্যা। ম্যাচ জেতানোর সম্মোহনী ক্ষমতা আজও অটুট, অম্লান। ইতোমধ্যে আট গোল করে ছুটছেন গোল্ডেন বুট জয়ের পথে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট শোভা পাচ্ছে তার মাথায়। ফিফার ‘পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে’ সৃষ্টিশীলতার তালিকায় তিনি আছেন শীর্ষে। চারটি অ্যাসিস্টও আছে; এর মধ্যে দুটি আবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে।
দুর্বার মেসিকে জায়গা ছেড়ে দিলে যে সর্বনাশ, তা ভালো করে জানা স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের। প্রতিপক্ষের অধিনায়ককে কড়া পাহারায় রাখার গুরুত্বদায়িত্ব তিনি তুলে দিতে পারেন এমেরিক লাপোখ্তের কাঁধে। আথলেতিক বিলবাওয়ের এই ডিফেন্ডারও আছেন দারুণ ফর্মে। ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবার্সির সঙ্গে দূর্ভেদ্য জুটি তিনি গড়ে তুলেছেন রক্ষণে। চলতি আসরে এ পর্যন্ত খেলা সাত ম্যাচে স্পেনের স্রেফ এক গোল হজমের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এই জুটির কার্যকারিতা।
লামিন ইয়ামাল বনাম নিকোলাস তালিয়াফিকো
দুজনের বয়সের ব্যবধান ১৪ বছর! কিন্তু ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণভাগের সবচেয়ে ক্ষিপ্র তারকা। সেখানে, ৩৩ বছর বয়সী তালিয়াফিকো আর্জেন্টিনার রক্ষণ দেয়ালের সবচেয়ে শক্ত পাথর; সরানো তো দূর অস্ত, নড়ানোই কঠিন!
ইয়ামাল অবশ্য চলতি আসরে এখনও প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারেননি পুরোটা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে শুরুতে তাকে ভুগতে হয়েছে। এরপর মাঠে ফিরে দেখিয়েছেন, যখন-তখন জ্বলে উঠতে পারেন তিনি।

গতি ও বক্সের ভেতরে বিপজ্জনক এলাকায় ক্ষিপ্র ছোটাছুটি করে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে পেনাল্টি এনে দেন দলকে। মিকেল ওইয়ারসাবাল তা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে নেন ‘লা রোজা’দের। তরুণ ইয়ামালের কল্পনাশক্তি, খেলা পড়তে পারার দক্ষতার প্রমাণ মিলছে ফিফার সৃজনশীলতার ‘পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে’ তার ছয় নম্বরে অবস্থানে।
ইয়ামালকে বোতলবন্দি করে রাখার দায়িত্ব অভিজ্ঞ তালিয়াফিকোর পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত বিশ্বকাপে এই লেফট-ব্যাক ছিলে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়কদের একজন। মাঝের সময়ে ঋদ্ধ হয়েছেন আরও। চলতি আসরেও আলবিসেলস্তেদের রক্ষণে অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে চলেছেন তিনি।
মূলত ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে তালিয়াফিকো ভীষণ শক্তিশালী, পরীক্ষিত ও সচেতন। যে সেনানীর ওপর নির্ভর করা যায় নির্ভার থেকে। জাতীয় দলের হয়ে ৮২ ম্যাচ খেলা এই ডিফেন্ডার ২০২২ বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলেছিলেন ১২০ মিনিট। বড় ম্যাচে দলের রক্ষণের জোয়াল দৃঢ়তা ও বিশ্বস্ততার সাথে টেনে নেওয়ার প্রমাণ তিনি আগেও দিয়েছেন, আবারও দিতে প্রস্তুত থাকবেন নিশ্চিতভাবেই।
রদ্রি বনাম এনজো ফার্নান্দেজ দ্বৈরথ
মেসি ও ইয়ামালকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে হলে ঠিকঠাক পেতে হবে বলের যোগান। সেটা আসবে মাঝমাঠ থেকে। মাঝমাঠ দখলের তুমুল লড়াই হতে পারে রদ্রি ও এন্সো ফের্নান্দেসের মধ্যে। রদ্রি শুরু থেকেই আছেন দুর্দান্ত ফর্মে, ফের্নান্দেস দেরিতে হলেও খুঁজে পেয়েছেন নিজেকে।
রদ্রি আবার স্পেন দলের অধিনায়ক। ফলে, তার দায়িত্বের ভার যে কারো চেয়ে বেশি। সেটা তিনি বয়েও চলেছেন অবিশ্বাস্য আস্থায়। প্রতিটি ম্যাচে নিখুঁত পাসের যোগান রেখেছেন অব্যাহত। চলতি আসরে, রদ্রির চেয়ে সফল পাস (৬৪৮টি) দিতে পারেননি আর কেউ। তার সঠিক পাস দেওয়ার সক্ষমতাও ঈর্ষণীয়, শতকরা ৯৩ শতাংশ!

শারীরিক সামর্থ্য ও দমের প্রমাণও রদ্রি দিয়েছে। ৮৩ হাজার ৮০২ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে এখন তিনি টুর্নামেন্টের রেকর্ডধারী। প্রতিপক্ষের আক্রমণের তাল মাঝমাঠে কেটে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। একই কাজ তিনি আরও সূচারুভাবে করতে চাইবেন ফাইনালে। কিন্তু সেখানে নিশ্চিতভাবে বাধ সাঁধবেন ফের্নান্দেস। রদ্রির জন্য ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে নামার সামর্থ্য আছে এই আর্জেন্টাইনের।
সাড়ে তিন বছর আগের বিশ্বকাপে, ফিফা সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জয়ী ফের্নান্দেস বল পায়ে তো বটেই, বল ছাড়াও অক্লান্ত পরিশ্রমের সামর্থ্য, মানসিকতা-দুটোই আছে। এ পর্যন্ত ৪৩ বার বল পুনরুদ্ধার করেছেন তিনি, যা আর্জেন্টিনার যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি।
ফের্নান্দেসের আবার প্রয়োজনের সময় গোল করার বাড়তি গুণও আছে।
মিশরের বিপক্ষে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় পড়া আর্জেন্টিনাকে যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোলটি তিনি এনে দিয়েছিলেন দুর্দান্ত হেডে। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, তখনও তিনি আসেন ত্রাতা হয়ে। মেসির পাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন গোলে ফেরান সমতা। পরে জয়সূচক গোলটি করেন লাউতারো মার্তিনেস।
ফাইনালেও মাঝমাঠের দখল রাখার পাশাপাশি, গোলের দাবি মেটাতে হতে পারে ফের্নান্দেসকে। নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আসরের শুরুর দিকে সন্তুষ্ট না থাকলেও, ইংল্যান্ডর ম্যাচের পর তিনি এখন আত্মবিশ্বাসে ফুটছেন টগবগ করে।


