মরক্কোর ফুটবল উন্নতিতে প্রশংসা করলেন ইনফান্তিনো

ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সক্ষমতা এবং ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়নে মরক্কোর অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। দেশটিতে অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপ ‘মরক্কো ২০২৬’-এর উদ্বোধন উপলক্ষে সফরে এসে মরক্কোর ফুটবল সংস্কৃতি ও বিশ্ব ফুটবলে তাদের ক্রমবর্ধমান অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মরক্কো। তাই এবারের বয়সভিত্তিক নারী বিশ্বকাপকে দেশটির জন্য নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও আয়োজক হিসেবে সক্ষমতা তুলে ধরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মরক্কোতে আবারও ফিরেছেন ইনফান্তিনো। তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে দেশটির ফুটবল অঙ্গনে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রথম ম্যাচে উপস্থিত থাকতে তাঁকে স্বাগত জানান রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মরক্কোর গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের সুযোগও বাড়ছে। এই টুর্নামেন্টের আয়োজন সেই অগ্রযাত্রারই আরেকটি উদাহরণ।

মরক্কোতে ফিরে আনন্দ প্রকাশ করে ফিফাপ্রধান দেশটির ফুটবলের প্রতি মানুষের গভীর আবেগের প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, ফুটবল মরক্কোর মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই ভালোবাসা শুধু মাঠের খেলা কিংবা গ্যালারিতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে সমাজে সহনশীলতা, সহাবস্থান ও শান্তির মতো ইতিবাচক বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটবলকে ঘিরে মরক্কোর মানুষের এই আবেগ দেশটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে। জাতীয় দল কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, ফুটবলকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের ব্যাপক আগ্রহ দেশটিকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। ইনফান্তিনোর বক্তব্যেও সেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর চোখে, ফুটবল কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ফলাফলের খেলা নয়; এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরিরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে মরক্কো। ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের আয়োজনের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনার দক্ষতা, সব মিলিয়ে দেশটি ভবিষ্যতের বড় আসরগুলোর জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। মরক্কোর সংবাদমাধ্যম হেসপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এসব অগ্রগতিই বিশ্ব ফুটবলের বড় আয়োজনগুলোতে দেশটির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও জোরালো করছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু আধুনিক স্টেডিয়াম থাকলেই চলে না। প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দলগুলোর যাতায়াত ও আবাসনের ব্যবস্থা, গণমাধ্যমের কাজের পরিবেশ এবং বিপুলসংখ্যক দর্শকের চাপ সামলানোর সক্ষমতা। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় এসব বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ছোট ও বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যতের বড় আসরের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপ মরক্কোর জন্য সে কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিভাবান তরুণী ফুটবলাররা নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে নারী ফুটবলের বিকাশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তরুণ খেলোয়াড়দের তুলে ধরার ক্ষেত্রেও টুর্নামেন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাগতিক হিসেবে মরক্কোর সামনে রয়েছে প্রতিযোগিতাটি সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবলের কাছে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ।

তবে মরক্কোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আরও বড়। ২০৩০ সালে স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে দেশটি। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ও বৃহৎ এই প্রতিযোগিতার আয়োজক হওয়া যেকোনো দেশের জন্যই বড় দায়িত্ব। কারণ, বিশ্বকাপের আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর এবং বিপুলসংখ্যক সমর্থকের যাতায়াত। এ ধরনের আয়োজন সফল করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম।

মরক্কোর জন্য ২০৩০ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা ও পরিচিতি আরও বাড়ানোর বড় সুযোগ। স্পেন ও পর্তুগালের মতো অভিজ্ঞ আয়োজক দেশের সঙ্গে মিলে বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে দেশটি আফ্রিকান ফুটবলের গুরুত্বও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারবে। একই সঙ্গে এই আয়োজন পর্যটন, ক্রীড়া অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ইনফান্তিনোর সফর ও মরক্কোর ফুটবল আয়োজন নিয়ে তাঁর প্রশংসা এমন এক সময়ে এল, যখন ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়ে দেশটির প্রত্যাশা বাড়ছে। অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপের মতো আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পরিচালনার অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছে মরক্কো। যদিও বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট এবং সিনিয়র পুরুষদের বিশ্বকাপের আয়োজনের ব্যাপ্তি ও চ্যালেঞ্জ এক নয়, তবু প্রতিটি আন্তর্জাতিক আসরই আয়োজক দেশের ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করে।

ফিফাপ্রধানের বক্তব্যে মরক্কোর ফুটবলপ্রেম, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশটির অগ্রগতির বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে মানুষের একত্র হওয়া এবং সেই আবেগকে ইতিবাচক বার্তায় রূপ দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর প্রশংসার অংশ। মরক্কো এখন সেই জনপ্রিয়তা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বড় আয়োজনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।

সব মিলিয়ে, অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপ মরক্কোর জন্য বর্তমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন হলেও দেশটির দৃষ্টি ২০৩০ সালের দিকে। স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে নিজেদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করাই এখন বড় লক্ষ্য। আর সেই পথচলায় ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ, উন্নত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে চায় মরক্কো।

spot_imgspot_img
spot_img

Related Articles